মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন

(বাংলাদেশের বর্তমান সময়টা বড্ড সংবেদনশীল। আস্থা-অনাস্থা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যা, শঙ্কা-সুযোগের ডামাডোলে আবর্তিত। জুলাই-আগস্ট মাসে যে ঐতিহাসিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে অনেকেই ফাটল দেখতে পাচ্ছেন। কিছুদিন ধরেই কিছু সমন্বয়ক ও নাগরিক কমিটির কিছু তরুণ নেতৃত্ব একটা নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছেন।)
শের ই গুল :
যে ছাত্ররা দেশকে রাজনৈতিক পঙ্কিলতা, কদর্যতা, অনৈতিকতা ও দেশস্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বাঁচাতে চায়, তারাই কেন-রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ভাবছেন? প্রশ্ন ওঠে তারা নিজেরাই সেই পঙ্কিলতায় ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা ভেবেছেন কি? এক সময়ের প্রচণ্ড প্রভাবশালী সাহসী দেশদরদি ছাত্রনেতারা পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের কাঠামোয় বন্দি হয়ে কী কী করেছেন আর কী কী হয়েছেন, তার উদাহরণ কিন্তু ভুরি ভুরি। তাই ভয় হয়! ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তি ও ভিনদেশের প্রলোভন সংবরণ সহজ কাজ নয়। অতীব কঠিন। আর এ যাত্রায় যদি পদস্খলন হয়, তাতে শুধু ছাত্রনেতারা নয়, তাদের পিছু নেওয়া সব ছাত্র-জনতা, এমনকি পুরো দেশের ভাগ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ছাত্রনেতারা যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে (পঙ্কিলতা ও ক্ষমতার রাহুগ্রাসমুক্ত, নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও আইনসংগত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত) রাজনৈতিক দল গঠন বিবেচনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব হবে কি? সমগ্র ছাত্রসমাজকে (দলের মূল সমর্থক) এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করেছেন কি? না করে থাকলে এখনই সময়। নচেৎ ‘সাধু সাবধান’।
বাংলাদেশের বর্তমান সময়টা বড্ড সংবেদনশীল। আস্থা-অনাস্থা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সত্য-মিথ্যা, শঙ্কা-সুযোগের ডামাডোলে আবর্তিত। জুলাই-আগস্ট মাসে যে ঐতিহাসিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে অনেকেই ফাটল দেখতে পাচ্ছেন। কিছুদিন ধরেই কিছু সমন্বয়ক ও নাগরিক কমিটির কিছু তরুণ নেতৃত্ব একটা নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারা বলছেন, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে জুলাই-আগস্টের বিপ্লব হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করতেই একটা নতুন দলের প্রয়োজন ছিল। হতেই পারে। অপরদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এমন সম্ভাবনায় বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করছে। কোনো দল মনে করে এটা সময়ক্ষেপণের চাল। কেউ মনে করছেন এটা কিংস পার্টি গঠনের পরিকল্পনা। আবার কেউ ভাবছেন, ভালোই হয়েছে ক্ষমতার ভাগীদার হওয়ার একটা সুযোগ হচ্ছে। পাশাপাশি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সমর্থকরা উৎফুল্ল হয়েছেন এই ভেবে যে, বিপ্লবীরা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করুক আর তাদের নেত্রী এ সুযোগে টুপ করে দেশে ঢুকে ক্ষমতায় বসে একটা একটা সমন্বয়ক, বিপ্লবী, বিরোধী দলের নেতা-নেত্রী ও সমর্থকদের শূলে চড়াবে। আর সাধারণ মানুষ ভাবছে, এটা কী হচ্ছে?
নির্লোভ সমন্বয়করা যারা দেশের জন্য, জাতির জন্য ছাত্র-জনতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা কি স্বার্থবাদী হয়ে যাচ্ছেন? ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভোর হয়ে সংগ্রামের আদর্শ বলিদান করছেন! পাশাপাশি এক একটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত করার দাবি নিয়ে মহা উন্মাদনা। এটা যে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিবেকবান ছাত্ররা কি সেটা বুঝতে পারছেন না? বিশ্ববিদ্যালয় হলেই কি পড়ার মান বেড়ে যাবে? পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু অনেক কলেজের সমন্বয়ে গঠিত। আমাদের দেশের ছাত্ররা অনেক বুদ্ধিমান এবং ইন্টারনেট যুগে তারা একটু ঘেঁটে দেখলেই কথাটার প্রমাণ পাবেন। তাই একদিকে ছাত্রদের নতুন দল গঠনের পরিকল্পনা আর ঠিক তখনই স্থানে স্থানে ছাত্রদের রাস্তা বন্ধ করে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষদের প্রচণ্ডভাবে আশাহত করছে। আর নিশ্চিতভাবে জুলাই বিপ্লবের বিরোধীরা এতে আনন্দিত। পাশাপাশি যেসব দল দীর্ঘ ১৬ বছর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, বিশাল ত্যাগ, তিতিক্ষায় জনগণকে সংগঠিত করেছেন, আশা দেখিয়েছেন, তারাও কি আজ ক্ষমতার গন্ধ পেয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, ফ্যাসাদ করছেন?
ভুল হতে পারে, কেন জানি মনে হয় উপদেষ্টামণ্ডলীর অনেক সদস্য এসব বিভাজন, বিগত ছয় মাসে ১৩৬টি দাবি আদায়ের আন্দোলনে বেশ পুলকিত। এই ভেবে তারা কতই না ক্ষমতাবান-এত দল, এত গোষ্ঠী, এত মানুষ তাদের কাছেই যাচ্ছে দাবি নিয়ে!
ক্ষমতার পরিধি জানান দেওয়ার জন্য কিছু দাবি মেনেও নেওয়া হয়। অন্যরাও ভাবল, এই তো সুযোগ। আগামী ছয় মাসে হয়তো দ্বিগুণ বা তিনগুণ দাবি উঠবে। ঠেলা সামলাও! এখন নিজ দোষ অন্যের ঘাড়ে দেওয়ার পাঁয়তারা! এখনই পুলিশকে লাঠি, টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হচ্ছে। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়; গুলিও ছুঁড়তে হবে।
যা হোক, বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছিল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে! তখন আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্ররাজনীতি থাকা উচিত কি না। আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতি বলতে এখনো বোঝায় কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনকে। ছাত্রদের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে দলের চাওয়া-পাওয়া যেখানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে অবশ্য ভিন্ন কথা। ছাত্ররাজনীতি মূলত ছাত্রদের ভালো-মন্দ, সুযোগ-সুবিধার ওপর আবর্তিত। যদিও দলীয়ভাবে ছাত্রদের মতাদর্শগত শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা দেওয়া হয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে সহায়ক ভূমিকা হিসাবে।
তবে একথা না বললেই নয়, পৃথিবীর কোথাও (নিশ্চিত বেশিরভাগ দেশেই) আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন-এমনকি ছাত্র, যুব, মহিলা, কৃষক সংগঠনের বিদেশ শাখা চোখে পড়েনি। ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রিস, কুয়েত, কাতার ইত্যাদি দেশে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া (পশ্চিমা দেশের কথা নাইবা বললাম) কোনো শাখা সংগঠন নেই। কেবল বাংলাদেশের, কেন? এর রহস্য আপনারাই চিন্তা করুন। এখন সময় হয়েছে বিদেশে এটা বন্ধ করার। বাংলাদেশিদের বিভাজনে এটা সবচেয়ে বড় কারণ। প্রবাসে বিভাজনের রাজনীতিকে ঠেকাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।
তবে এখনকার বিবেচ্য বাংলাদেশে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠন। আমার মতে, ছাত্ররা সরাসরি রাজনীতি করতে চাইলে, দল গঠন করতে চাইলে তাকে স্বাগত জানান উচিত। পশ্চিমা দুনিয়ায় রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। অনেক দেশে ভোট প্রদান বাধ্য করা হচ্ছে। পশ্চিমা দেশে রাজনীতিতে ছাত্রদের অংশগ্রহণ তো আরও কম। রাজনীতির প্রতি অনীহাই অন্যতম কারণ, সেখানকার মানুষ রাজনীতি ও রাজনীতিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং রাজনীতিকদের প্রভাব সম্পর্কে সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠছে! সে তুলনায় তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বিভিন্ন দপ্তরের কার্যপ্রণালী ও দক্ষতার ওপর (এড়ড়ফ মড়াবৎহধহপব) আস্থা রাখে। এ প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের যুবসমাজ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছেন এটা খুশির খবর! তবে একটা কিন্তু রয়েছে!
এর অর্থ এই নয় যে, ছাত্ররা রাজনীতি করবেন না বা রাজনৈতিক যে জঞ্জাল হয়েছে, তা পরিষ্কার করতে পারবেন না! আমার মতে, তারাই এ ঘুণেধরা সমাজকে, পচে যাওয়া সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়, ছাত্ররা যখন মিথ্যাচার, দুর্নীতি, ভণ্ডামি, জালিয়াতি ও পঙ্কিলতামুক্ত-তখন জনগণের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছাকে অন্য কোনো উপায়ে অর্জন সম্ভব কিনা। বিকল্প কোনো পথ আছে কিনা, যাতে ছাত্রশক্তি দেশ নির্মাণে এবং নীতি-নির্ধারণে রাষ্ট্র এবং জনগণের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ভূমিকা পালন করতে পারেন! তারা জনগণ এবং দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো পদক্ষেপে হিমালয়ের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
ছাত্রসমাজের কাছে বিনীত অনুরোধ, শত প্রলোভন, চাপ, সম্পদ এবং ক্ষমতার লোভের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। পুরো দেশ আপনাদের পেছনে থেকে গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেছে ‘আমাদের ছোট ছেলে-মেয়েরা কখন যে বড় হয়ে গেছে, টেরই পাইনি! আজ তারাই আমাদের মুক্ত করেছে’। এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? এ সম্মান হেলায় হারাবেন না। কারও প্ররোচনাতেও না। তাই চুলচেরা বিশ্লেষণের খাতিরে সবিনয় অনুরোধ, নিচে বর্ণিত একটি সমাধান যা বিভিন্ন দেশে পরীক্ষিত, সেটা বিবেচনা করতে পারেন-
সংস্কার আন্দোলন কমিটি বা বাস্তবভিত্তিক যে কোনো নামেই একটি চাপ গোষ্ঠী (ওহঃবৎবংঃ এৎড়ঁঢ়) গঠন করুন। যে চাপ গোষ্ঠী সরকারি আইন এবং নীতিগুলোকে প্রভাবিত বা পরিবর্তন করতে অথবা বাস্তবায়ন করতে চাপ প্রয়োগ করবে। যে কোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতে নির্বাচনে প্রার্থী না দিলেও ‘জনবান্ধব’ বা ‘দেশবান্ধব’ প্রার্থীদের সমর্থন করবে বা নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের প্রভাবিত করবে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সব ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে (উদ্দেশ্য, আদর্শ ও কর্মকাণ্ডের পরিসর ছাত্ররাই ঠিক করবে)।
একটি রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী হলো এমন একটি গোষ্ঠী, যাদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তারা আইন এবং সরকারি নীতি প্রভাবিত করার প্রচেষ্টায় সংগঠিত। তারা নির্বাচিত আধিকারীদের এমন আইন পাশ করার চেষ্টা করবে, যা তাদের উদ্দেশ্য ও আদর্শ ধারণ করবে এবং যা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট।
একদিকে তারা যেমন দেশ ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে সমর্থন দেবে, তেমনি লবিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বা জনপ্রতিনিধিদের প্রভাবিত করতে মিটিং, আইনি পরামর্শ এবং আইনের খসড়া তৈরিতে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে ছাত্রদের চাপগোষ্ঠী সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করবে; কিন্তু তারা কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা দায়িত্ব চাইবে না। সরকারের যে কোনো কার্যক্রম সাধারণের কল্যাণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলে, কারও স্বার্থ চাপানোর জন্য অগ্রহণযোগ্য কৌশল ব্যবহার করা হলে, সরকারে দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে এবং সমাধান আদায় করবে। জনসাধারণকে প্রভাবিত করে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে, সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করবে। প্রয়োজনে প্রতিরোধ গড়ে তুলে জনস্বার্থের পরিপন্থি কর্ম ও নীতিমালা পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি ছাত্রদের স্বার্থগোষ্ঠী সরকারের সমালোচনার একটি দায়িত্বশীল উৎস হিসাবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নাগরিক এবং সরকারের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে এবং দলের সদস্যদের জন্য তাদের মতামত প্রকাশের একটি গণতান্ত্রিক মাধ্যম হিসাবে কাজ করবে। ছাত্রদের এ চাপগোষ্ঠী, বাক-স্বাধীনতা, সমাবেশ এবং সমিতির গণতান্ত্রিক অধিকার ইত্যাদি সমুন্নত রাখার রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে।