মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

(বর্জ্য আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অভিশাপ,উন্নত বিশ্বে এটি জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস।বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।)
রাজধানীর ক্রমবর্ধমান বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় আমিনবাজারে গড়ে উঠেছে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য পুড়িয়ে উৎপাদন করা হবে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ব্যয়বহুল প্রযুক্তি, পরিবেশের ঝুঁকি, বিতর্কিত চুক্তি ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে বাড়ছে মানুষের শঙ্কা। দীর্ঘদিন অবহেলা অলসতায় পড়ে থাকা এই প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি।
অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় চায়না ও জাপানের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে, ১ হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এ জন্য সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সিটি করপোরেশনের কাছে এমন প্রস্তাব জমা পড়া নতুন নয়। গত এক দশকে দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০ টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু একটি প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক প্রস্তাব দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এ ছাড়া জমির সংকট, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিবেশদূষণের শঙ্কাও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।
তবে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাও স্পষ্ট নয়। আবার প্রকল্প অনুমোদনে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও কেউ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) ওপর চাপ কমবে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, নগরে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন ৩ হাজার ২৬৯ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে। বর্জ্য থেকে ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছিল বিদেশি কিছু প্রতিষ্ঠান ডিপি ক্লিন টেক ইউকে লিমিটেড ও ইমপ্যাক্ট এনার্জি গ্লোবাল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) প্রকল্পের আওতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এই প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা এখন পর্যন্ত অনুমোদিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যাতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরের পরিবেশদূষণ কমবে এবং ল্যান্ডফিলের (বর্জ্যাগার) ওপর চাপ কমবে।
২০২৩ সালের জুনে চীনের প্রতিষ্ঠান সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি বর্জ্য থেকে ৩০-৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছিল সিটি করপোরেশন। তবে পরিবেশদূষণের শঙ্কায় সিটি করপোরেশনের সে আবেদন বাতিল করে মন্ত্রণালয়। ওখানেই থমকে যায় ওই প্রস্তাব।
এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে ২০১৯ সালের ১০ অক্টোবর সিটি করপোরেশনকে প্রস্তাব দিয়েছিল চীনের আরেক কোম্পানি পাওয়ার চায়না। এ জন্য সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে ১০ একর জায়গা এবং প্রতিদিন দেড় হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। তবে তা–ও আলোর মুখ দেখেনি।
প্লস্টিকসহ নানা বর্জ্যে ভরাট হয়ে থাকে নগরের খালগুলো মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন খালগুলো পরিষ্কার করলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার বর্জ্যে সয়লাব হয়ে যায়।
এই তিন প্রতিষ্ঠান ছাড়া গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল ন্যানোটেক সলিউশন অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেড, টেকনিস রিউনিডাস আলফানার অ্যান্ড সিইইজি ইম্প্যাক্ট এনার্জি, স্যাটারাম ফাইভ কো-ফার্ম-এমই-জয়েন্ট ভেঞ্চার, অকল্যান্ড গ্রিন এনার্জি লিমিটেড, গ্রিন পাওয়ার লিমিটেড, সিটি ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট কোম্পানি, স্কলার্স পাওয়ার লিমিটেড, ডঙ্গুয়ান কিউই রাফা এনভায়রনমেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।
এ ছাড়া প্রস্তাব জমা দিয়েছিল লিড অ্যান্ড ইপিসি পার্টনার ও এসডিআইসি পাওয়ার হোল্ডিং কোং লিমিটেড, এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেড, সৌদি-জার্মান পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, কনসোর্টিয়াম অব সিএনটিআই এলওয়াইজেড, নোরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন লিমিটেড, গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক এবং কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬ থেকে ৩৫ একর জমি এবং এক থেকে আড়াই হাজার টন বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছিল।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বলছে এটি নগর ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী উদ্যোগ। তবে মাঠের বাস্তবতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে ইতোমধ্যেই উঠছে নানা প্রশ্ন।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রটি দেশের সবচেয়ে বড় বর্জ্যনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প হতে যাচ্ছে। আইপিপি মডেলে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। তবে পরিবেশগত ছাড়পত্র না পাওয়ায় এখনো মূল কাজ শুরু হয়নি।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এ প্রক্রিয়া ঝুলে আছে কেন
ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পাহাড়সম এই বর্জ্য আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার জন্য যেখানে অভিশাপ, সেখানে উন্নত বিশ্বে এটি জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গত এক দশকে সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশি-বিদেশি অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও আলোর মুখ দেখেনি একটিও। সম্প্রতি জাপানি প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১২-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এটাও ঝুলে যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত চসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে চীন, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মতো দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ৩৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যাচাই করেছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভূমির সংকট কিংবা অসম্পূর্ণ সমীক্ষার অজুহাতে প্রকল্পগুলো থমকে গেছে। এক হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে যদি ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হয়, তবে তা কেবল জ্বালানি সংকট মেটাবে না, বরং ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে ফেলবে। এতে নগরের পরিবেশ দূষণ ও নদীর স্বাস্থ্য রক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারত।
এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত যৌক্তিক—এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের (স্থানীয় সরকার ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়) এখতিয়ারাধীন, তাই অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। আবার পরিবেশ দূষণের শঙ্কা দেখিয়ে অনেক সময় প্রস্তাব নাকচ করা হয়, অথচ আধুনিক ‘ইনসিনারেশন’ বা বর্জ্য পোড়ানো প্রযুক্তিতে পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়ে সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলে রাখাকেই যেন শ্রেয় মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ জমা দেয়নি। তবে প্রশ্ন জাগে, এক দশকে ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কি একটিও নির্ভরযোগ্য ছিল না? নাকি আমাদের পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও জমির সংস্থান দিতে গাফিলতি ছিল? চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সবার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি। উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ না করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে যায়।
এখন সময় এসেছে গতানুগতিক ফাইলের আদান-প্রদান বন্ধ করে কার্যকরী পদক্ষেপে যাওয়ার। সরকারের উচিত একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বা আন্তঃমন্ত্রণালয় সেল গঠন করা, যা এই ধরনের সবুজ জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত নিশ্চিত করবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবটিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে।
বর্জ্য আমাদের জন্য কোনো আবর্জনা নয়, বরং একটি সম্পদ। যদি ২০টি প্রস্তাবের একটিও বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অযোগ্যতা হিসেবেই গণ্য হবে। চট্টগ্রামের পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলোকে আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সদিচ্ছা থাকলে বর্জ্যের স্তূপই হতে পারে আলোর উৎস।