মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৪:৫৯ পূর্বাহ্ন

কাউকে যদি ডালিম বা আনার খাওয়ার সুপরামর্শ দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন- কতটুকু খাবো, কখন খাবো, কিভাবে খাবো? বেশি খেয়ে ফেললে ক্ষতি হবে না তো? কোনোরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি-না?
প্রশ্নগুলো শুনে আহ্লাদিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মানুষ তাহলে খাদ্য-সচেতন হচ্ছে, খাবার হিসেবে কোনোকিছু গ্রহণ করার আগে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করছে…! কিন্তু সেই মানুষগুলোই যখন দিনের পর দিন প্রক্রিয়াজাত আলগা তেল খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে এবং তেলে ভাজা অখাদ্য খেয়ে পেট ফুলে যাচ্ছে (গ্যাস হচ্ছে), তারপরও কথিত ভোজ্যতেল উৎপাদন তথা বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোকে জিজ্ঞেস করেন না- আপনারা আমাদের যে তেল খাওয়ান, সেটা কিসের তেল? কিভাবে তৈরি? আপনারা যে তেল খাওয়ান, সেটা কতদিন আগে প্রক্রিয়াজাতকৃত? আপনারা আমাদের যে তেল খাওয়ান, সেটাতে পেট ফুলে যায় কেন? হার্ট ব্লক হয় কেন? হজমে সমস্যা হয় কেন? আপনারা আমাদের যে তেল খাওয়ান, তাতে চেহারা মলিন হয়ে যায় কেন? হাড়ক্ষয়জনিত সমস্যা বাড়ে কেন? ঘরে ঘরে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হচ্ছে কেন? গণহারে রক্তচাপ বাড়ছে কেন? রক্তে শর্করা বাড়ে কেন? থাইরয়েডের সমস্যা হয় কেন? আপনারা যে তেল খাওয়ান, তাতে ওজন কেন বেড়ে যাচ্ছে? অথচ এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট জবাব মিললে উন্মোচিত হয়ে যেতো- চারদিকে মহামারীর মতো এতো রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্য কারণ!!!
মহিলা সমাজে ইতোমধ্যে এই ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, তেল ছাড়া রান্নাই করা যায় না! আচ্ছা ভাবুন তো- সৃষ্টির শুরুর সময়টার কথা… পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কোন তেলের রান্না খেতেন? বিবি হওয়া কি আদৌ রান্না করার সুযোগ পেয়েছিলেন? কেননা আগুন প্রজ্বলনের প্রচলন হয়েছে আরো অনেক পরে (যদিও আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আদমকে সকল বিষয়ে জ্ঞানদান করেছিলেন)। তারপরও আদম (আ.) কোনোপ্রকার আলগা তেল না খেয়েও এই পৃথিবীতে ১০০০ বছর বেঁচেছিলেন। অথচ আমরা ভোজ্যতেল গিলে ৪০/৫০ বছরও সুস্থ থাকতে পারছি না!
সৃষ্টির শুরুর কথা যদি বাদও দেন, আমাদের দাদী-নানীরা কোন ব্র্যান্ডের তেল দিয়ে রাঁধতেন? দেশ স্বাধীনের পরপর বিদ্যমান চিনি, তেল ও লবণ সংকটের কথা যদি উহ্যও রাখি, বাস্তবতা হলো- গৃহকর্তাগণ সপ্তাহে একদিন তেলের ছোট্ট শিশি (সর্বোচ্চ ২৫০ মিলি) নিয়ে হাটে যেতেন; সেইটুকু তেলে ৮-১০ সদস্যের পুরো পরিবারের সারা সপ্তাহের রান্না হয়ে যেতো। অথচ এখন ৪-৫ জনের পরিবারে মাসে ১২/১৪ লিটার তেল লাগে, ভাবা যায়?!?
কথিত সয়াবিন তেল উৎপাদনের সময় প্রথমে পরিশুদ্ধ (refine) করার জন্য ৫০০/৬০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তেল উত্তপ্ত করা হয়। তখন সেটা একপ্রকার পোড়া কালো মোবিল-এ পরিণত হয়। তারপর ব্লিচ করে পরিষ্কার (স্বচ্ছ) করা হয় এবং কৃত্রিম রঙ যোগ করে চকচকে বানানো হয়। সবশেষে কৃত্রিম ভিটামিন A, B, C, D ইত্যাদি (যে ভিটামিনগুলো মানবদেহ কখনোই খাদ্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না) মিশিয়ে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারজাত করা হয়। এর ক্ষতিকারক দিক হলো- রক্তে কোলেস্টেরল-এর মাত্রা বাড়ায়, ডায়বেটিস, গ্যাস্ট্রিক/ আলসার, কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, এমনকি কথিত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর হলো- ভোজ্য তেল-এর নামে বাজারে যা কিছু বিক্রি হচ্ছে, সেগুলো মোটেও ভোজনযোগ্য নয়! এক কেজি সয়াবিন বীজ পিষে ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ গ্রাম তেল বের করা সম্ভব। কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদনকারীরা এক কেজি বীজকে প্রচণ্ড তাপ দিয়ে এবং এর সঙ্গে আরো অনেক সিনথেটিক কেমিক্যাল মিশিয়ে প্রায় এক কেজি সমপরিমাণ তেলই বের করে- যে কারণে তেলের খাদ্যগুণ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না! এরপর রান্নার সময় আরো একবার তাপে (উত্তপ্ত হয়ে) এই তেল দেহের জন্য ক্ষতিকারক উপাদানে পরিণত হয়! ইউসি রিভারসাইড গবেষণা মতে- কথিত সয়াবিন তেল কেবল স্থূলতা এবং ডায়বেটিস নয়, এটি অটিজম, আলঝেইমার রোগ, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার মতো স্নায়বিক অবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে! আমরা বাজার থেকে যাই কিনে খাই, সেটা আসলে পাম; হজমে প্রচণ্ড সমস্যা হয় এই তেল খেলে। অথচ সেই অখাদ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সামাজিক গণমাধ্যমে কত না হৈচৈ!
পুষ্টিচাহিদা পূরণে মানবদেহে তেল-এর প্রয়োজন আছে বৈকি, মহান সৃষ্টিকর্তা সে কারণে প্রকৃতিতে বিদ্যমান সকল খাবারে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু না কিছু তেল যুক্ত করে রেখেছেন। মানুষ যদি সব সময় জীবন্ত খাবার (ফলমূল, কাঁচা সালাদ ইত্যাদি) খায়, তাহলে আলগা সিনথেটিক তেলের কোনো প্রয়োজনই হবে না। কিন্তু ভোজ্যতেল বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো এমন সব কেমিক্যাল মেশানো উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে তেল হিসেবে আমাদের সামনে হাজির করছে, যাতে স্থূলতা, ডায়বেটিস, হৃদরোগ কিংবা রক্তচাপের মতো সমস্যা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে; তারপরও মানুষ সচেতন হচ্ছে না!
একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন- গণমাধ্যমে (টেলিভিশন ও পত্রিকায়) রান্নার অনুষ্ঠানগুলো স্পন্সর করে বিভিন্ন তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো। রান্নার অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র সেইসব রেসিপি-ই দেখানো হয়, যেগুলো রাঁধতে তেল বেশি লাগে এবং রান্নাটা শুরুই হয় ফ্রাইপ্যান-এ তেল ঢালার মাধ্যমে! যে রান্নায় তেল লাগে না বা ব্যবহার কম, সেগুলো রান্নার অনুষ্ঠানে দেখানো হয় না কাদের ইশারায় (কু-বুদ্ধিতে)?
স্রেফ বাণিজ্যিক স্বার্থে তেলকে রান্নার প্রধান ও অপরিহার্য উপাদান হিসেবে পরিগণিত করানো হয়েছে। তেল ছাড়া নাকি তরকারিতে স্বাদ হয় না! কিন্তু রান্না করা খাবারে স্বাদের কৃতিত্ব আসলে তেল-এর নয়, মশলার। বিশ্বাস না হলে এক চামচ কথিত সয়াবিন তেল মুখে ঢেলে দেখুন- গা গুলিয়ে উঠবে, বমিও হয়ে যেতে পারে! যে তেল মুখে নিলে এমন অবস্থা হয়, সেই তেল রান্নায় ব্যবহার করলে স্বাদ বাড়ায় কেমনে?
স্পষ্ট জেনে রাখুন- স্বাদের জন্য তেলের কোনো ভূমিকা নেই। তেল বড়জোর চোখের তথা মনের ক্ষুধা মেটায়- মানে দেখতে চকচক করে, কিন্তু এর পুরোটাই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। রান্না করা খাবারে স্বাদ আসে বিভিন্ন প্রকার মশলা থেকে- যেগুলো নানাবিধ ঔষধি গুণে গুণান্বিত এবং শরীরের জন্য উপকারী। তাই তেল ছাড়া শুধু পানি দিয়ে বেশি পরিমাণে মশলার মিশ্রণে তরকারি রান্না করলে একদিকে স্বাস্থ্য-ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে শরীর তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা ফিরে পাবে। তাই আসুন- সামাজিকভাবে আলগা তেল বর্জন করার সপক্ষে সচেতনতা তৈরির প্রয়াস চালাই।