মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

কোনো ব্যক্তি,গোষ্ঠী,কোম্পানি বা প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনোই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং সামগ্রিক জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। একটি প্রগতিশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো তার নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। সমসাময়িক নানামুখী বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে অপরাধ সিন্ডিকেট দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখাই দেশপ্রেমের মূল কথা, আর এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রকে এখনই সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে। অপরাধ সিন্ডিকেট ও মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ:
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে অপরাধীদের যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের আওতায় আনা জরুরি। দেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করে রাখা কালোবাজারি ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলোকে দ্রুত চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এদের অর্থায়নের উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে হবে। একইভাবে, যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে কেবল খুচরা মাদক বিক্রেতা নয়, বরং মাদকের মূল অর্থায়নকারী এবং আন্তর্জাতিক রুট নিয়ন্ত্রণকারী “গডফাদার”দের সমূলে উৎপাটন করা আবশ্যক। অপরাধীদের সময়মতো রুখে দিতে না পারলে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চূড়ান্ত দায়ভার রাষ্ট্র ও সরকারের ওপরই বর্তায়। তাই সংকট প্রকট হওয়ার আগেই দূরদর্শী সতর্কতা ও কঠোর পদক্ষেপ অবলম্বন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
জননিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার: সুশাসনের মূল ভিত্তি-জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রের প্রধান সাংবিধানিক ও নৈতিক অঙ্গীকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে নাগরিক সমাজের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশার জন্ম নেয়। প্রতিটি নাগরিক যেন সমাজে নিরাপদে চলাচল ও নির্ভয়ে বসবাস করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ার গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে—আইন সবার জন্য সমান এবং অপরাধী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাজার ব্যবস্থাপনা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ: একটি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বস্তির ওপর। বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কারণে দ্রব্যমূল্যের অনাকাঙ্ক্ষিত ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এই সমস্যা সমাধানে কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করা জরুরি, যা বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করবে। একই সাথে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং উৎপাদক থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর বিপণন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে কৃষক সঠিক মূল্য পাবে এবং ভোক্তা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারবে। এছাড়া, মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারে সব ধরনের অবৈধ চাঁদাবাজি কঠোর হস্তে বন্ধ করা গেলে পণ্য পরিবহন খরচ হ্রাস পাবে এবং খুচরা বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা: টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি-দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তির সাথে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমান জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বহিরাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি, সাইবার অপরাধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ শান্তি ও টেকসই নিরাপত্তা বজায় না থাকলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে অপরাধ ও অপকর্মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখতে হবে। অগ্রগতি ও উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করেন। সমসাময়িক এই সংকটের মুহূর্তে জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের আপসহীন ভূমিকা কেবল অপরাধই নির্মূল করবে না, বরং একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। জনস্বার্থে এই সমস্ত সমস্যার সমাধান এবং অপরাধ অপকর্ম নির্মূল করা এখন সময়ের দাবি। যেকোনো ধরনের অবহেলা বা বিলম্ব কেবল সংকটকেই ঘনীভূত করবে, তাই রাষ্ট্রকে তার নৈতিক দায়িত্ব পালনে এখনই সর্বোচ্চ দৃঢ়তা ও কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে হবে।