মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫২ পূর্বাহ্ন

দেশে চলমান ভয়াবহ শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও গণ-অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সারাদেশে সংঘটিত সকল পাশবিক ঘটনার দ্রুত বিচার, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জের নিকলী।
আজ ২৪ মে ২০২৬, রোজ রবিবার সকাল ১০ ঘটিকায় নিকলী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু জোট, নিকলী’-এর আয়োজনে এবং ‘কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন (সিআরইএ)’ প্রকল্পের সহযোগিতায় ‘রামিসা ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ দাবির এই কর্মসূচিতে ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের।
বিদ্ধ বিবেক, কাঠগড়ায় বিচার ব্যবস্থা
মানববন্ধনে ক্ষুব্ধ বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রামিসাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড জাতির বিবেককে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। এগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক দুর্বলতা, সামাজিক নীরবতা এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনের ফাঁকফোকর গলে খুনি ও ধর্ষকেরা মুক্ত আকাশে ঘুরে বেড়ানোয় সমাজে এই জঘন্য সংস্কৃতি মহামারী আকার ধারণ করেছে।
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক সনদের চরম লঙ্ঘন
সমাবেশে বক্তারা দেশের আইনি কাঠামোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
সংবিধানের অবমাননা: বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮ এবং ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্যহীনতা এবং নিরাপত্তার অধিকার দেওয়া হয়েছে। অথচ আজ দেশের নারী ও শিশুরা নিজ ভূমিতেই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন।
আন্তর্জাতিক সনদের ব্যর্থতা: বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC)-এ স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা ও সহিংসতামুক্ত জীবন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে।
”বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর শত শত নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদন্ত এবং সামাজিক চাপের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো শুধু ন্যায়বিচার থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে না, বরং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
খুদে শিশুদের আকুতি: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা
এদিনের মানববন্ধনে সবচেয়ে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় যখন নিকলী উপজেলার বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের কোমলমতি ছোট ছোট শিশুরা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমে আসে। রামিসা হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং নিজেদের নিরাপত্তার আকুতি নিয়ে খুদে শিক্ষার্থীরা দেশের অভিভাবক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে। শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
আন্দোলনের ডাক ও বিশিষ্টজনদের বক্তব্য
সমাবেশে বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন—কোনো অপরাধী যেন ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের জোরে পার না পায়। ধর্ষক ও শিশু হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ করার আলটিমেটাম দেন তারা। অন্যথায়, সারা দেশে আরও বৃহত্তর ও কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়।
জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু জোটের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক আবীরের সভাপতিত্বে উক্ত প্রতিবাদ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন:
আয়ুব আলী মাস্টার (সহ-সভাপতি, জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু জোট)
মুহাম্মদ ফরিদুল আলম (সাধারণ সম্পাদক, জেন্ডার সমতা ও জলবায়ু জোট)
জেসমিন আক্তার (নারী নেত্রী)
জয়দেব আচার্য্য (সাংবাদিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব)
উক্ত মানববন্ধনে স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সচেতন অভিভাবক, সমাজকর্মী, নারী নেত্রী এবং শত শত সাধারণ নাগরিক উপস্থিত হয়ে রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন। বক্তারা সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে মরবে না, কোনো নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।”