
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। একটি শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ভয়াবহ সংবাদ যখন মানুষের সামনে আসে, তখন শুধু শোক নয় ক্ষোভ, আতঙ্ক এবং অসহায়ত্ব একসঙ্গে গ্রাস করে পুরো সমাজকে।
রামিসার বাবার কান্নাভেজা কথাগুলো আজ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। একজন অসহায় বাবার আর্তনাদ যেন আমাদের সমাজব্যবস্থা, মানবিকতা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতিই এক কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
তিনি বলছিলেন আমি কোনোদিন কারও সঙ্গে অন্যায় করিনি। আমার এই ছোট্ট মেয়েটার কী অপরাধ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজ পুরো জাতির কাছে ঋণ হয়ে রইলো।
একজন বাবা তার সন্তানকে শুধু বড় করেন না নিজের সমস্ত স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ সেই সন্তানের মাঝেই বাঁচিয়ে রাখেন। রামিসাও ছিল তার বাবার পৃথিবীর সবচেয়ে আপন অংশ। বাবার জন্য শরবত বানিয়ে রাখা, দিনে বহুবার ফোন করে বলা বাবা, তুমি কখন আসবা? এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ছিল একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সুখ।
কিন্তু ভয়ংকর বাস্তবতা হলো, সেই নিষ্পাপ শিশুটিকেই পাশের ফ্ল্যাট থেকে খণ্ডিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের। ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধ নয় এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম আঘাত।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সিআইডি ও ফরেনসিক টিম আলামত সংগ্রহ করেছে। তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তাই দায়িত্বশীল সমাজ হিসেবে আমাদের উচিত গুজব নয়, সত্য তথ্যের ওপর নির্ভর করা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা।
তবে এটিও সত্য, দেশে একের পর এক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে বিচারহীনতার ভয় গভীর হচ্ছে। বহু পরিবার আজ বিচার চাইতেও আতঙ্কিত হয়। কারণ তারা বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে অপরাধী আদৌ শাস্তি পাবে কি না।
“Justice delayed is justice denied” এই বহুল উচ্চারিত বাক্যটি আজ আবারও বাস্তব হয়ে সামনে এসেছে। বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেলে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ অন্যায়ের কাছে পরাজিত হয়।
শিশু রামিসার দাদা-দাদির কবরের পাশেই তার চিরনিদ্রার খবর মানুষকে আরও ভারাক্রান্ত করেছে। যে শিশু একদিন কাবা শরীফে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সে আজ পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতা পেছনে ফেলে চলে গেছে পরপারে। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো বাবা সন্তান হারিয়ে বলতে বাধ্য হবেন না আমি বিচার চাইবো না… কারণ আপনারা বিচার করেন না।
রামিসার হত্যাকারীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা এখন শুধু একটি পরিবারের দাবি নয় এটি দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের দাবি। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সভ্যতার সব অর্জনই ব্যর্থ হয়ে যায়।
আজ সময় এসেছে শুধু শোক প্রকাশের নয় মানবিকতা, সামাজিক সচেতনতা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর। ভালো থেকো রামিসা। এই সমাজ তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।