মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতি যেখানে অকৃপণ হাতে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিয়েছে, সেই জনপদ মৌলভীবাজার। চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, পাহাড়ি টিলা আর বিস্তীর্ণ হাওরের অপরূপ রূপে সমৃদ্ধ এই জেলা কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সব যোগ্যতাই রাখে। তবুও সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক অবকাঠামোর অভাবে এই সম্ভাবনা আজও পুরোপুরি বাস্তব রূপ পায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে—পরিকল্পিত পর্যটন উন্নয়ন, একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুকরণ—এই তিনটি উদ্যোগই পারে জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে।
পর্যটনে আন্তর্জাতিক মানের উদ্যোগের আহ্বান
চা শিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল মৌলভীবাজারের অর্থনীতিতে পর্যটন হতে পারে তৃতীয় শক্তিশালী স্তম্ভ। জেলার উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এবং হাকালুকি হাওর। এই স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ‘ট্যুরিজম সার্কিট’ গড়ে তোলা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বর্তমানে পর্যটন কার্যক্রম মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগনির্ভর। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মৌলভীবাজার এশিয়ার মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে।
২০ লাখ মানুষের জন্য সরকারি মেডিকেল কলেজের দাবি
প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাস এই জেলায়। কিন্তু এখনো এখানে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিলেট বা ঢাকায় নিতে গিয়ে প্রায়ই সময়ক্ষেপণ হয়, কখনো ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি।
বিশেষ করে চা-শ্রমিক ও হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উন্নত চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু চিকিৎসা সেবাই নিশ্চিত হবে না, বরং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি কোনো বিলাসিতা নয়—বরং সময়োপযোগী ও ন্যায্য দাবি।
শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে বদলে যাবে যোগাযোগ চিত্র
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবাহী শমশেরনগর বিমানবন্দর বর্তমানে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। অথচ সিলেট বিভাগের এই অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবাসে কর্মরত। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হলে প্রবাসীদের যাতায়াত সহজ হবে, একই সঙ্গে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে পর্যটকদের আগমনও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক পর্যটন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে আকাশপথের বিকল্প নেই। বিমানবন্দর সচল হলে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে রফতানিযোগ্য চা শিল্পে নতুন গতি আসবে।
সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশাস্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের অভিমত—এই তিনটি প্রকল্প একে অপরের পরিপূরক। বিমানবন্দর চালু হলে পর্যটন বাড়বে, পর্যটন বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়বে, আর উন্নত স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতি তাদের আহ্বান—
সমন্বিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে মৌলভীবাজারের এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া হোক। কারণ মৌলভীবাজার কেবল একটি জেলা নয়; এটি দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।মৌলভীবাজারের উন্নয়ন মানেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নতুন অধ্যায় সংযোজন।