মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৫:২১ পূর্বাহ্ন

একটি দেশে রোগ, রোগী ও চিকিৎসাধীন রোগী মৃত্যুর, কোন রোগে কত টাকা বিল কোন পরীক্ষায় কত টাকা বিল তার সম্পূর্ণ প্রকৃত তথ্য জানতে হলে সব ধরনের হাসপাতালের তথ্যের সমন্বয় থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বেসরকারি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও গ্রিন লাইফ হসপিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. মঈনুল আহসান। দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আমার হাসপাতালের সব তথ্য নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে পাঠানো হয়। তারা যেভাবে চায় সেভাবে দেয়া হয়। কিছু হাসপাতাল বিষয়টি মেনে চলে। তবে অনেক হাসপাতালই এটা করে না।’
হাসপাতালভিত্তিক তথ্য স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। একই কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন (এনএলএম)। তারা জানায়, রোগীরা কোন চিকিৎসার জন্য কোন হাসপাতালে যাচ্ছে তা জানা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে চিকিৎসাসেবা খাতের ৬২ শতাংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি বছর কত রোগী কী রোগে কতদিন চিকিৎসা নেয় এবং কতজন মারা যায় এর হিসাব সরকার পাচ্ছে না। এমনকি কোন রোগে কোন চিকিৎসায় কত টাকা নেয়া হয় তার কোন নির্দিষ্ট রুলস রেগুলেশন নেই এক এক প্রাইভেট হাসপাতালে এক এক রকম বিল ।ফলে রোগ ও রোগীভিত্তিক যে হিসাব সরকার দেয়, তা মূলত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের।
দেশে চিকিৎসাসেবা খাতের
চার বছর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের পরিষেবা, আকার, অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে এক জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। নব্বইয়ের দশকে সারা দেশে বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠেছিল ৩৮৪ টি। বর্তমানে এর সংখ্যা নব্বই দশকের চেয়ে ৫০ গুণ বেড়েছে বলে অন্য এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
মোট জনসংখ্যার অনুপাতে শয্যা কম। তবে গত কয়েক দশকে আনুপাতিক হারে বেড়েছে শয্যা সংখ্যা। সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা হাজার হাজার। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৭ হাজার ৮৫৪টি। মোট ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩০১টি শয্যার মধ্যে বেসরকারিতে রয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার। বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১০ হাজারের বেশি। আর ব্লাড ব্যাংক ১৯২টি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় বহির্বিভাগে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৪৭ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়েছে। জরুরি বিভাগে এসেছিল ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার। ভর্তি হয়েছিল ৮১ লাখ ৩২ হাজার রোগী। ওই বছর বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭০টি। ছোট পর্যায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে সরকারি হাসপাতালে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৮৫ রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার তথ্য ব্যবস্থাপনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি স্বাস্থ্য খাতের আকার বড়। তবে যদি শুধু চিকিৎসাসেবার কথা ধরা হয় তবে অবশ্যই বেসরকারি খাতের আকার বড়। মোট চিকিৎসার ৬৫ শতাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) ও লাইন ডিরেক্টর (এইচআইএস) অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ধীরে ধীরে বেসরকারি চিকিৎসা কার্যক্রম জাতীয় তথ্য ভাণ্ডারে আনতে শুরু করেছি। বেসরকারি খাতের আংশিক চিত্র রয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য না হওয়ায় তালিকায় দেখাইনি। শুধু বেসরকারির সিজারিয়ান সেকশনের তথ্য উপস্থাপন করতে পারছি। এরই মধ্যে বেসরকারি ও স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কিছু হাসপাতাল রয়েছে, তাদের তথ্য পেতে কাজ করছি। আশা করি পাঁচ বছরের মধ্যে পরিপূর্ণ একটি ডিজিজ প্যাটার্ন ও অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে পারব। প্রস্তাবিত পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রামে (পঞ্চম এইচটিএনএসপি) বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
দেশে প্রতি বছর মারা যাওয়া রোগীর মধ্যে অসংক্রামক রোগাক্রান্ত ৬৭ শতাংশ বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এ তথ্য পুরোটা সরকারি হাসপাতালভিত্তিক। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য না থাকায় বড় একটি সংখ্যা অজানা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদরা।
সরকারের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের যে হিসাব রয়েছে মূলত ৩৫-৪০ শতাংশের, অর্থাৎ সরকারি তথ্য। এ অসম্পূর্ণ হিসাব দিয়ে একটি দেশের রোগ ও রোগীর চিত্র এবং নীতি হাতে নেয়া যায় না। কিন্তু এমনটিই বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথ্য দিতে বাধ্য, কিন্তু তথ্য নেয়ার উপায় সরকারকে করতে হবে।’