মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন

শের ই গুল:
অনেকে পরিকল্পনা করে ব্যাংক বা ফিনানশিয়াল ইন্সটিটিউট থেকে লোন নেন। উদ্দেশ্য থাকে—বিজনেস দাঁড় করানো, বাড়ি বানানো, গাড়ি কেনা বা অন্য কিছু। কিন্তু ভুলে যাবেন না—লোন মানে শুধু টাকা ধার নয়, বরং প্রতি মাসে সুদের আগুনে পুড়তে শুরু করা! একটা উদাহরণ শুনুন— আপনি ২৫ লাখ টাকার লোন নিলেন ৫ বছরের জন্য, ইন্টারেস্ট রেট ১৪.৪৯%। প্রতিমাসে আপনার EMI দাঁড়াল প্রায় ৫৫,৫০০ টাকা। মানে বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আপনাকে দিতে হবে। আপনি ভাবলেন— “বছরে ৬.৬ লাখ দিচ্ছি, নিশ্চয়ই ৫ লাখ প্রিন্সিপাল কমবে, আর ১.৫ লাখ ইন্টারেস্ট যাবে।”
কিন্তু না! বাস্তবে প্রথম বছরে আপনি যত টাকা দেন, তার অর্ধেকেরও বেশি চলে যায় সুদে! আপনার মূল লোন কমে মাত্র ৩–৩.৫ লাখ টাকা। বাকি ৩ লাখ বা তার বেশি টাকা কেটে নেয় ‘সুদ’—এই শোষণ ব্যবস্থা। কেন এমন হয়? এটা হলো Reducing Balance Loan বা Amortized Loan সিস্টেম। এখানে শুরুর দিকে EMI থেকে বেশি অংশ সুদ হিসেবে কেটে নেয়, আর প্রিন্সিপালের অংশ কম রাখে। সময় যত বাড়ে, তত সুদের অংশ কমে, প্রিন্সিপালের অংশ বাড়ে।
সমস্যা হয় কখন?
যদি মাঝপথে চাকরি হারান, আয় বন্ধ হয়, অসুস্থতা আসে বা ব্যবসা ডুবে যায়— তবুও আপনাকে EMI দিতে হবে। না পারলে লোনের ফাঁস আপনার পরিবার, সম্পদ, এমনকি মানসিক শান্তিও কেড়ে নেবে।
তাহলে কী করবেন?
লোন নেওয়ার আগে সম্পূর্ণ EMI Schedule ভালোভাবে দেখে নিন। প্রতি কিস্তিতে কত সুদ আর কত প্রিন্সিপাল যাচ্ছে তা জেনে নিন।
সুযোগ থাকলে ১–২ বছরের মধ্যে আর্লি সেটেলমেন্ট করুন। সম্ভব হলে লোন না নিয়ে বিকল্প পথ খুঁজুন।
কেন ইসলামে সুদ হারাম?
কারণ এতে ধনী আরও ধনী হয়, গরীব আরও গরীব হয়। সুদভিত্তিক অর্থনীতি আসলে নিপীড়নের হাতিয়ার— যেখানে ধনীর গলায় মালা, আর গরীবের গলায় দড়ি! সতর্ক থাকুন, সচেতন থাকুন। একটি ভুল সিদ্ধান্ত আপনার আগামী ১০ বছর কেড়ে নিতে পারে। এই লেখা পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়—সবার সঙ্গে শেয়ার করুন। হয়তো আজই কেউ লোন নিতে যাচ্ছেন, অথচ জানেন না এর ভিতরের ভয়াবহতা!
ঋণ থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় কী? আসলে কিছু কিছু জিনিস উদ্ধার পাওয়ার আগে, ঐ গর্তে না পড়ার ব্যাপারে কীভাবে সতর্ক থাকা যায়? বাঘের থাবাতে যদি একবার ঢোকেন, উদ্ধার পাওয়া খুব কঠিন! গর্তে পড়ে গেলেন তারপরে উদ্ধার পাওয়া আর গর্তে না পড়া, দুটো জিনিস এক না। আপনাকে চেষ্টা করতে হবে গর্তে না পড়ার জন্যে। বাঘের থাবাতে যদি একবার ঢুকে যান উদ্ধার পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। মাত্র ২৬ জন মানুষের সম্পত্তি ৩৮০ কোটি মানুষের সমান কীভাবে? আর অধিকাংশ সময় ঋণ করার ক্ষেত্রে আমরা আসলে হিসাবই করি না, আমি যে ঋণ করছি শোধ করব কীভাবে? আমার শোধ করার এবিলিটিজ আছে কিনা। আমরা প্রলুব্ধ হয়ে যাই। এবং আমরা প্রলুব্ধ হয়ে যাই বলেই অবস্থা কী? গত ১০ বছরে ২০১০ সালে বিশ্বের অর্ধেক সংখ্যক মানুষের সম্পত্তির মালিক ছিল ৩৮৮ জন। ২০১৫ সালে এটা কমে গেল ৮৫ জনে। ৮৫ জন হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র অর্ধেক মানুষের সম্পত্তির মালিক। ২০১৬ সালে এটা ৬২ জন। ২০১৭ সালে ৪৩ জন। ২০১৮ সালে মাত্র ২৬ জন। মাত্র ২৬ জন মানুষ এখন বিশ্বের অর্ধেক সম্পত্তির মালিক। মানুষ সংখ্যা কত? ৩৬০-৭০ কোটি হবে।
তো এই গরিব ৩৬০ কোটি মানুষের সম্পত্তি সে সমপরিমাণ সম্পত্তির মালিক হচ্ছে ২৬ জন। এবং এই ২৬ জন ধনীর সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা ৩৮০ কোটি মানুষের সম্পদের সমান। কীভাবে, হাউ? আপনাকে ঋণজর্জরিত করে আপনাকে ঋণগ্রস্ত করে। ঋণের পরিণতি ঋণ আর কিস্তি যার জীবনে আসছে প্রথম তো খুব ভালো লাগে আহ, স্বপ্নের গাড়িটা। বোঝা যায় কয়েকদিন পরে। গাড়িটা তখন নিজেই স্বপ্ন হয়ে যায়। এই ঋণের চেয়ে অভিশাপ আর কিছু নাই। যে কারণে এই ঋণ থেকে রসুলুল্লাহ (স) সবসময় পানাহ চেয়েছেন। কারণ ঋণ মানুষকে হতদরিদ্র করে দেয়।
ঋণের পরিণতি হচ্ছে একজন মানুষ হতদরিদ্র হবে। যেরকম ধরুণ এর মধ্যে তা-ও বছরখানেক আগে একজন শিল্পপতি বলছিলেন, তার হাজার কোটি টাকার সব ফ্যাক্টরি সম্পত্তি সব আছে। এগুলো সব প্রজেক্ট করা। পরিশ্রম করছেন কিন্তু ব্যাংকের সুদ দিতে দিতেই শেষ।
আফসোস করে বলছেন যে, পরিশ্রম করি দিনরাত আমি, আর লাভ সব চলে যায় ব্যাংকে। তো ঋণ যার জীবনে আসছে, সে জীবনে ঋণ থেকে বের হতে পারে নাই।
ক্ষুদ্রঋণ কীভাবে এলো?
আমাদের দেশে এই ক্ষুদ্রঋণ এলো কীভাবে? পুঁজিপতিরা শোষকরা দেখল, একজন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো দরকার। ক্রয়ক্ষমতা যদি না বাড়ানো হয় তাদের পণ্য বিক্রি হবে না। কীভাবে ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে? ঠিক আছে ঋণ দাও।
ঋণ দিয়ে কী কিনবে সে? আগে সাইকেল কিনত ট্রানজিস্টার কিনত, এখন ঋণ করে মোবাইল কিনে প্রথম। মোবাইল তো মোবাইল, স্মার্টফোন। এখন ঋণ করার প্রথম কাজই হচ্ছে ঋণের টাকা দিয়ে সে স্মার্টফোন কিনবে।
নারীদের জন্যেই কেন এই ক্ষুদ্রঋণ?
পুরুষদেরকে কিন্তু এই ক্ষুদ্রঋণ দেয় না। কারণ জানে যে ঋণ নিলে সে পালিয়ে যাবে। পালিয়ে আরেক জায়গায় চলে যাবে। সেখানে গিয়ে বিয়ে টিয়ে করে ঘরসংসার করবে। ঐখান থেকে ঋণ করে আবার আরেক জায়গায় পালিয়ে যাবে। ঐখানে গিয়ে আবার বিয়ে করে ঘরসংসার করবে।
এজন্যে ক্ষুদ্রঋণ সব হচ্ছে মহিলাদের। এদের পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নাই। কোথায় পালাবে। অন্য কোথাও পালালে সে-তো আরেকটা বিয়ে করতে পারছে না, সে পড়বে বিপদে। অতএব এদেরকে ঋণ দাও। কিস্তির ভেলকিবাজিতেই আপনি ঋণগ্রস্ত এবং আসল কোনোদিন আদায় করবা না, কিস্তি আদায় করবা শুধু। দুই তিন চার কিস্তি যখনই বাদ যাবে, তখন কী করো? আবার এটাকে রিশিডিউলিং করো।
কিছু লোকজন আবার বুদ্ধি বের করল যে, না ঠিক আছে, ব্রাকের ঋণটাকে শোধ করো প্রশিকা থেকে, প্রশিকার ঋণশোধ করো গ্রামীণ থেকে। আবার যখন গ্রামীণেরটা শোধ করতে হবে আবার ব্রাক থেকে লোন নাও। আগে যেহেতু শোধ করা আছে এভাবে ঘুরতে থাকে। কয়দিন ঘুরবে সে।
যেহেতু টাকাটা এমনি চলে আসছে পরিশ্রম ছাড়া এই টাকাটাকে সে অপচয় করে ফেলে। যার ফলে সে পরিশ্রম করতে থাকে কিন্তু ঋণ তার আর কখনো শোধ হয় না। সে শুধু কিস্তিই দিতে থাকে দিতে থাকে দিতে থাকে এবং ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে।