মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন

আব্দুল্লাহ আল মামুন (শের ই গুল) :
কয়েক’শত টাকা খরচ করে একটি ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইন টিভি বা নিউজ পোর্টাল, অনলাইন পত্রিকার মালিক হয়ে নিজের নামটি সেটে দিয়ে নিজেকে সম্পাদক বানিয়ে, ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে ভূয়া সম্পাদক সেজে আরো বিভিন্ন এলাকায় সাংবাদিক নিয়োগের নামে ভূয়া সাংবাদিক তৈরী করছে একটি চক্র। তারা নিজেরা প্রথমে কোনো পত্রিকায় প্রবেশ করে কিছুদিন সাংবাদিক সেজে থাকে, কোনোভাবে মোবাইলে নিউজ আপলোডের বিষয়টি আয়ত্ব করতে পারলেই, ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটি ওয়েবসাইট খুলেন এবং নিজে হয়ে যায় সম্পাদক। বিষয়টি এভাবেই নিয়ম বহির্ভূতহীন সহজলভ্য হওয়াতে মিডিয়াভুক্ত পত্রিকার সম্পাদক এবং মূলধারার সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। দেশ ও জাতির কাছে, এই মহান পেশাটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
দেখা যায় যে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী দপ্তরে শত শত আবেদন জমা পড়ে। তখন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা পড়ে যায় বিপাকে। তাদের সাথে আঁতাত করে ভূয়া সাংবাদিকেরা সরকারের দেয়া নির্বাচনের পর্যবেক্ষন কার্ড দিয়ে নিজেদেরকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে সমাজে প্রচার করে। ভুয়া সাংবাদিকদের উৎপাত, অতিষ্ঠ সাধারন মানুষ, নিরব প্রশাসন।
বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ কিংবা কোন পরিবার সামাজিকভাবে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে বিষয়টি কোনভাবে এসব সাংবাদিক সম্পাদকরা টের পেলে ছুটে যায় ছুটে যায় ঘটনাস্খলে তাদেরকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে করে হয়রানী। পরবর্তীতে তাদের সংবাদ প্রচার করবে ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় অর্থ, এটাই তাদের মূল সাংবাদিকতা এবং সম্পাদক সাজার মূলমন্ত্র। এসব সাংবাদিক সম্পাদকরা নিজেরা প্রাথমিকের গন্ডি না পার হলেও দাপটের সাথে গলায় নাম সর্বস্ব অনলাইন পোর্টালের কার্ড ঝুলিয়ে প্রতারণা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাজারে বুট-বাদাম বিক্রেতা, হোটেলের বয়, পান ব্যবসায়ী, ভ্যান চালক, ড্রাইভার, হকার, জমির দালাল, ভাত বিক্রেতা, রাজমিস্ত্রি, টাইল্স ও নির্মান কাজের শ্রমিক এখন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সাধারন মানুষের সাথে প্রতারনা করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
সচেতন মহল মনে করে এসব ভূয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রকৃত সাংবাদিকেরা তাদের পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অবিলম্বে এসব ভূয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনে প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করছেন। কিছু অপেশাদার অনভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক সাংবাদিক নাম ধারন করে সামান্য টাকার বিনিময়ে কিছু সম্পাদক নামধারী প্রিন্ট ও অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকরা এসব ভূয়া সাংবাদিক তৈরী করছে। যতই দিন যাচ্ছে ভুয়া সাংবাদিকদের উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলছে। এলাকার চিহ্নিত বখাটেরা প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা খাটানোর জন্য কিছু স্বার্থলোভী নামধারী সম্পাদককে টাকা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র কার্ড। আবার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া তাদের চ্যানেলের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নাম দিয়ে চাং বিক্রি করে এসব সাংবাদিকদের নিকট। তারা তখন একটি টিভি চ্যানেলের পরিচয় দিয়ে হাতে বুম নিয়ে চাঁদাবাজি এবং ফিটিং বাজির ডন সেজে অহংকারের চরম পর্যায়ে পৌঁছে সাংবাদিকতার সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িত মহান পেশাকে ধর্ষণ করছে। এসব নামধারী সাংবাদিকরা পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) গলায় ঝুলিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষকে ঠকিয়ে জীবন জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছে। ভূয়া সাংবাদিকেরা এভাবে চলতে থাকলে সাংবাদিক সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে। এদেরকে খুজে বের করে সাংবাদিক সমাজ থেকে বিতাড়িত না করলে দেশ ও সামাজের উন্নয়ন কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ ও প্রকৃত সাংবাদিক মহল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বারবার সাংবাদিকদের সংস্কার নিয়ে কথা বললেও সাংবাদিকদের ডিগ্রি পাশ থাকতে হবে ইত্যাদি কথা বললেও এখন পর্যন্ত এই সংক্রান্ত কোনো আইন বাস্তবায়ন না হওয়াতে বিষয়টি অনেকটাই রাজনৈতিক মিথ্যা প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সেহলী পারভীন। সবকিছুর জন্য দেশের আইন ব্যবস্থা আইনের প্রয়োগ, সিস্টেম লস ইত্যাদি দায়ী বলে মনে করেন, বিজ্ঞ সাংবাদিকরা। এ বিষয়ে মূলধারার একাধিক সাংবাদিকের সাথে কথা বললে তারা জানায় সবকিছুর জন্য সরকার দায়ী। একটি পত্রিকার অনুমতির জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে ডিক্লেয়ারেশন পেতে হয়, এই সম্পূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করেন একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে একজন অশিক্ষিত, অনভিজ্ঞ ব্যাক্তি কিভাবে ডিক্লেয়ারেশন পায়? অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, নাম লিখতে পারে না, তিনি পত্রিকার মালিক। এখন যদি কেউ জেলা প্রশাসক কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট এর দিকে আঙ্গুল তুলে বলে, কত টাকার বিনিময়ে ডিক্লেয়ারেশন বিক্রি করা হয়েছে, তারা কিভাবে পারে সাংবাদিক এবং সম্পাদকের যে স্থানটি শুধুমাত্র শিক্ষিত সমাজের জন্য, যাদেরকে জাতির বিবেক বলা হয়, সমাজের দর্পণ বলা হয়, সেই স্থানে অপদার্থ গাদা সাদৃশ্য এক শ্রেণীর চাঁদাবাজ ধান্দাবাজদের পত্রিকার পরিচয়ের সুবিধা দিয়ে জাতির সাথে তামাশা করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে একাধিক প্রেসক্লাব। এমনকি উপজেলা, থানা পর্যায়েও প্রেসক্লাবের ছড়াছড়ি। প্রেসক্লাবগুলো যেন হয়ে উঠেছে সাংবাদিকদের বিভেদ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম!
সাংবাদিকদের পেশাগত মান উন্নয়নে প্রেসক্লাবগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। অথচ অধিকাংশ জায়গায় ‘মূল ধারার’ সাংবাদিকরা প্রেসক্লাব সম্পর্কে দৃশ্যত অনাগ্রহী। অনেক ক্ষেত্রেই প্রেসক্লাব খুলে ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠছে। প্রেসক্লাবের বাইরেও রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সমিতি, সাংবাদিক ক্লাব, অনলাইন ক্লাবসহ নানা নামে খোলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠান।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, প্রেসক্লাব খুলে এখন অনেকেই ধান্দাবাজিতে নেমেছেন। নাম-সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকেরা এগুলো করছেন। ঢাকায় যারা কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই জাতীয় প্রেসক্লাব বা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য। ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে এখন প্রেসক্লাব। এদের সঙ্গে মূল ধারার সাংবাদিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে তারা ক্লাব খুলে বসেছেন। অথচ যারা রেজিষ্ট্রেশন দিচ্ছেন, তাদের এগুলো দেখা উচিত। আবার পত্রিকার হকারসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ যাদের কোনো যোগ্যতা নেই তারাও একটা পত্রিকার সম্পাদক-মালিক হয়ে উঠেছেন।