হযরত কাসিম ইবনে হাসান (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য ও বীরত্বপূর্ণ চরিত্র” তিনি ছিলেন মাওলা হযরত আলী (আঃ)-এর পৌত্র (নাতি) এবং দ্বিতীয় ইমাম হযরত হাসান ইবনে আলী (আঃ)-এর পুত্র”
কারবালার ঐতিহাসিক ও হৃদয়বিদারক যুদ্ধে তাঁর ত্যাগ ও বীরত্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস”
১]—শৈশব ও কারবালার যাত্রা:
হযরত কাসিম (আঃ) যখন অত্যন্ত ছোট, তখন তাঁর পিতা ইমাম হাসান (আঃ) শাহাদাত বরণ করেন” পিতার ওফাতের পর চাচা ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁকে নিজের সন্তানের মতো পরম স্নেহে লালন-পালন করেন” ফলে চাচার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়” ৬০ হিজরিতে যখন ইমাম হুসাইন (আঃ) মদিনা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন কিশোর কাসিমও তাঁর পরিবারের সাথে এই ঐতিহাসিক সফরে সঙ্গী হন”
২]—হকের পথে মৃত্যু মধুর চেয়েও মিষ্টি:
কারবালার ময়দানে পৌঁছানোর পর, আশুরার আগের রাতে (৯ম মহররম) ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর সঙ্গী ও পরিবারের সদস্যদের একত্রিত করেন” তিনি সবাইকে জানান যে, আগামীকালের যুদ্ধে তাঁদের সবার শাহাদাত নিশ্চিত” সেদিন রাতে ১৩ বছরের কিশোর হযরত কাসিম (আঃ) তাঁর চাচা ইমাম হুসাইনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “চাচাজান! শাহাদাতের তালিকায় কি আমার নামও আছে?”
—ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর ভাতিজাকে জড়িয়ে ধরে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “বাবা কাসিম, তোমার কাছে মৃত্যু কেমন মনে হয়?”
তখন হযরত কাসিম (আঃ) সেই ঐতিহাসিক ও ঈমানদীপ্ত জবাব দিয়েছিলেন:
—চাচাজান, আপনার সাথে আল্লাহর পথে এই মৃত্যু আমার কাছে মধুর চেয়েও মিষ্টি” ভাতিজার এই জবাব শুনে ইমাম হুসাইন (আঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, “হ্যাঁ বাবা, তুমিও আগামীকাল নির্মমভাবে শহীদ হবে”
৩]—ময়দানে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা:
১০ই মহররম (আশুরার দিন) যখন ইমাম হুসাইনের একে একে সব সঙ্গী এবং আহলে বায়তের সদস্যরা শহীদ হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত কাসিম (আঃ) যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার জন্য চাচার কাছে অনুমতি চান” কিন্তু ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর বড় ভাই ইমাম হাসানের এই স্মৃতিচিহ্নটিকে চোখের সামনে যুদ্ধে পাঠাতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না” কাসিম বারবার চাচার পায়ে ধরে মিনতি করার পর ইমাম অত্যন্ত ভারী হৃদয়ে কাসিমকে যুদ্ধের অনুমতি দেন”
৪]—বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ:
হযরত কাসিম (আঃ) যখন ময়দানে নামেন, তখন তাঁর শরীরে জড়ানোর মতো উপযুক্ত কোনো বর্ম বা ঢাল ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন বয়সে কিশোর” ইমাম হুসাইন (আঃ) নিজের আমামা (পাগড়ি) দিয়ে কাসিমের কাফন ও পোশাক তৈরি করে দিয়েছিলেন” ময়দানে গিয়ে তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে ইয়াজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হন” শত্রুরা তাঁর কম বয়স দেখে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি আরবের কুখ্যাত বীরদের ধুলোয় মিশিয়ে দেন” তরবারি চালনায় তিনি তাঁর দাদা হযরত আলী (আঃ)-এর বীরত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন” পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি বীর বিক্রমে লড়াই করে শত্রুসেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দেন”
৫]—শাহাদাত বরণ:
এক পর্যায়ে ইয়াজিদ বাহিনীর এক নিষ্ঠুর সেনা ওমর ইবনে সা’দের নির্দেশে চারদিক থেকে হযরত কাসিমকে ঘিরে ফেলা হয়” চারপাশ থেকে তাঁর ওপর পাথর ও তীরের বৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকে” আমর ইবনে সা’দ আজদী নামের এক লম্পট শত্রু পেছন থেকে তরবারি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে” গুরুতর আহত হয়ে ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় কিশোর কাসিম চিৎকার করে ডেকেছিলেন:
”আলাইকা মিন্নাস সালাম, ইয়া আম্মাহ্!” (হে চাচাজান, আপনার প্রতি আমার সালাম!)
ভাতিজার আর্তনাদ শুনে ইমাম হুসাইন (আঃ) এক শিকারি বাজের মতো ময়দানে ছুটে আসেন এবং ঘাতককে আঘাত করেন” কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে” ইয়াজিদের অশ্বারোহী বাহিনী যখন ইমামের আক্রমণ দেখে পিছু হটছিল, তখন তাদের ঘোড়ার খুরের নিচে পড়ে হযরত কাসিমের পবিত্র শরীরটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়”
৬]—কাসেমের উদ্দেশ্যে ইমামের শেষ কথা:
ইমাম হুসাইন (আঃ) যখন কাসিমের রক্তাক্ত ও ছিন্নভিন্ন দেহের কাছে পৌঁছান, তখন তিনি দুঃখের সাথে বলেছিলেন:
—ধিক্কার সেই জাতিকে যারা তোমাকে হত্যা করেছে! আল্লাহর কসম, তোমার চাচার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে যে, তুমি তাকে ডেকেছ কিন্তু সে তোমাকে বাঁচাতে পারল না”
ইমাম হুসাইন (আঃ) তাঁর এই প্রিয় ভাতিজার রক্তাক্ত দেহটি কোলে তুলে তাঁবুতে নিয়ে আসেন এবং আলী আকবরের লাশের পাশে শুইয়ে দেন”
৭]—তার ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা:
কারবালার ইতিহাসে হযরত কাসিম (আঃ)-এর এই আত্মত্যাগ যুবসমাজ ও তরুণদের জন্য এক শাশ্বত প্রেরণা” অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে কীভাবে নিজের জীবনের পরোয়া না করে হকের পথে অবিচল থাকতে হয়, তরুণ বয়সেই তিনি বিশ্ববাসীকে তার অনন্য শিক্ষা দিয়ে গেছেন”ইয়া হযরত কাসিম (আঃ)