গণপূর্তে সরকারি অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাকির হোসেনকে ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন
শাপলা আক্তার
চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের দরপত্র প্রক্রিয়া, কাজের বাস্তবায়ন এবং সরকারি অর্থ পরিশোধকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, কিছু কাজের ক্ষেত্রে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা হয়নি। পাশাপাশি কাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগের সূত্র ধরে পাওয়া দরপত্রসংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি নথি পর্যালোচনায় চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন একাধিক উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় দরজা-জানালা মেরামত, বহিরাংশের প্লাস্টার, অভ্যন্তরীণ রং, সিভিল ও স্যানিটারি সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দরপত্রের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন
একটি দরপত্রের নথিতে সংশ্লিষ্ট কাজের সরকারি প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। অভিযোগকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দর প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় কম হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের দর ছিল প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এ অবস্থায় ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়নের কোন কোন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের দর প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি হওয়া মাত্রই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না। দরপত্রের শর্ত, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক মূল্যায়ন, সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
কাজের মান ও বিল পরিশোধ নিয়েও অভিযোগ
দরপত্রের পাশাপাশি কাজ বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধের বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও নথিপত্রের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কোথাও কাজের পরিমাণ বা মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকারি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট কাজের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, মাপবই (Measurement Book), কাজ সম্পন্নের সনদ, বিল-ভাউচার, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের নথি যাচাই করা জরুরি। নথির সঙ্গে সরেজমিনে কাজের বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখলেই অভিযোগের সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব।
ঠিকাদারের বক্তব্য
মাদার বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম রাজু অভিযোগ করেন, গণপূর্ত বিভাগের কিছু কাজে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দরপত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে প্রতিযোগিতার সুযোগ পাচ্ছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাজ পাওয়ার পর বাস্তবে কাজের মান ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তবে ঠিকাদারের এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো প্রয়োজন।
জাকির হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে ঘিরেও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের তদারকি, কাজের অগ্রগতি যাচাই এবং সরকারি অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় তার দায়িত্ব ও ভূমিকা কী ছিল—তা স্পষ্ট করার দাবি রয়েছে।
তবে জাকির হোসেন সরাসরি কোনো অনিয়মে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এই প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দরপত্র থেকে শুরু করে কাজ সম্পন্ন ও বিল পরিশোধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা নথিপত্রের মাধ্যমে শনাক্ত করাও সম্ভব।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের ই-জিপি তথ্য, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, চুক্তিমূল্য, মাপবই, বিল-ভাউচার, কাজ সম্পন্নের সনদ এবং অর্থ ছাড়ের রেকর্ড পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় সরেজমিন পরিদর্শন করে নথির সঙ্গে বাস্তব কাজের মিলও যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি অর্থের অপচয় বা আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসতে পারে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থানও স্পষ্ট হবে। তাই অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।