দ্বিতীয় পর্ব
বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন, এরপরও প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে খালেকুজ্জামান
৪৬ প্রাণহানির সেই ভবনের অনুমোদন ঘিরে প্রশ্ন; অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস ও নাগরিকত্ব নিয়েও অভিযোগ, প্রয়োজন নথিভিত্তিক যাচাই
শাপলা আক্তার
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্বে সামনে আসছে রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহত এবং ১৩ জন আহত হন। পরবর্তী সময়ে ভবনটির নকশা, অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
আর এই ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হিসেবে আলোচনায় আসে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম।
২০১১ সালে নকশা অনুমোদনের দায়িত্বে ছিলেন খালেকুজ্জামান
রাজউক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে খালেকুজ্জামান চৌধুরী রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তাঁর দায়িত্বের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—নকশা অনুমোদনের সময় ভবনটির ব্যবহার, বহির্গমন ব্যবস্থা, সিঁড়ি এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—নকশা অনুমোদনের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকলেই পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের জন্য ওই কর্মকর্তাকে সরাসরি দায়ী করা যায় না। দায় নির্ধারণের জন্য অনুমোদিত নকশা, সংশোধিত নকশা, নির্মাণ-পরবর্তী পরিবর্তন, ব্যবহার অনুমোদন, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অনুমোদিত নকশা বনাম বাস্তব ভবন—কোথায় ছিল পরিবর্তন?
বেইলি রোডের ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—২০১১ সালে যে নকশা অনুমোদিত হয়েছিল, ভবনটি কি ঠিক সেই নকশা অনুযায়ী নির্মিত ও ব্যবহৃত হয়েছিল?
কারণ নকশা অনুমোদনের পর নির্মাণকাজে পরিবর্তন, ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন, অতিরিক্ত স্থাপনা বা অনুমোদনবহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম হয়ে থাকলে তার দায় আলাদা পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে।
তাই এই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন—
– ২০১১ সালের মূল অনুমোদিত নকশা;
– পরবর্তী সংশোধিত নকশা থাকলে তার কপি;
– ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও ছাড়পত্র;
– ভবন ব্যবহারের অনুমোদন;
– রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন;
– অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র;
– ভবনটির পরবর্তী ব্যবহার পরিবর্তনের অনুমোদন;
– অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্তে এসব নথি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা।
এসব নথি পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যাবে, অনুমোদনের সময়কার নকশা ও পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল কি না।
৪৬ প্রাণহানির পরও পদোন্নতি—প্রশ্ন এখানেই
বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, তাঁর বিষয়ে আগের অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বেইলি রোডের ভবন অনুমোদন ও নির্মাণে তিনি কোনো অনিয়ম করেননি।
অন্যদিকে, একই সময়ের পরবর্তী প্রশাসনিক অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
প্রশ্ন হলো—বেইলি রোডের ভবনের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ওই ঘটনার পর কোনো অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন হয়েছিল কি না।
যদি হয়ে থাকে, সেই মূল্যায়নের ফল কী?
আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কেন হয়নি?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকেই বের হওয়া উচিত।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস ও নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চাকরিজীবনের আরেকটি আলোচিত অধ্যায় তাঁর দীর্ঘ সময় অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকে ঘিরে।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করে এবং চাকরিজীবনে তিনি একাধিকবার সেখানে অবস্থান করেছেন। কিছু প্রতিবেদনে তাঁর অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব এবং স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (Permanent Residency) এক বিষয় নয়। প্রকাশিত অভিযোগে দুই ধরনের বিষয়ই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে তাঁর পাসপোর্ট, নাগরিকত্বের তথ্য, সরকারি চাকরির নথি এবং বিদেশে অবস্থানের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিদেশে অবস্থানের নথি কোথায়?
তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে উচ্চতর শিক্ষা ছুটি ও বিদেশে অবস্থানসংক্রান্ত বিভাগীয় মামলার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে সরকারি নথির বরাত দিয়ে ২০১৬ সালে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখন অনুসন্ধানের প্রশ্ন হচ্ছে—
তিনি কোন সময়ে কী ধরনের ছুটিতে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন?
ছুটির অনুমোদন কে দিয়েছিল?
ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি যথাসময়ে দেশে ফিরেছিলেন কি না?
বিদেশে অবস্থানকালে কোনো চাকরি বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন কি না?
এবং তাঁর বিদেশে অবস্থান ও নাগরিকত্ব/স্থায়ী বসবাসের বিষয়ে সরকারি চাকরির নথিতে কী তথ্য দেওয়া হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বিষয়টি অনেক বেশি পরিষ্কার হবে।
নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না—নথিতেই উত্তর
কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশের নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে তার আইনগত অবস্থান, বাংলাদেশি সরকারি চাকরি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের সঙ্গে বিষয়টির কোনো সাংঘর্ষিকতা আছে কি না—তা আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী নির্ধারণের বিষয়।
সুতরাং খালেকুজ্জামান চৌধুরী আদৌ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক কি না, নাকি শুধু স্থায়ী বসবাসের অনুমতি রয়েছে—এটি নিশ্চিত না করে তাঁকে ‘দ্বৈত নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
তবে যেহেতু এ বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থা এবং সরকারি চাকরির নথিতে দেওয়া তথ্য যাচাই করা।
একই ব্যক্তিকে ঘিরে পুরোনো শাস্তি, বেইলি রোড ও বিদেশ-প্রশ্ন
একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতের বিভাগীয় শাস্তির তথ্য রয়েছে। অন্যদিকে ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তাঁর দায়িত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আবার তাঁর দীর্ঘ বিদেশ অবস্থান ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব/স্থায়ী বসবাস নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সবগুলো বিষয় আলাদা আলাদা ঘটনা হলেও একজন বর্তমান শীর্ষ সরকারি প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে এগুলোর প্রশাসনিক মূল্যায়ন হয়েছিল কি না—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তদন্তের আওতায় আসা উচিত কোন নথি?
এই অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি নথি পর্যালোচনার দাবি উঠছে—
১. গ্রিন কোজি কটেজের ২০১১ সালের অনুমোদিত নকশা।
২. নকশা অনুমোদনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বিবরণ।
৩. ভবনের পরবর্তী সংশোধিত নকশা ও ব্যবহার অনুমোদন।
৪. অগ্নিনিরাপত্তা ও ভবন পরিদর্শনের নথি।
৫. অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে নকশা অনুমোদনের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
৬. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশযাত্রা ও ছুটির সরকারি নথি।
৭. অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের বিষয়ে তাঁর সরকারি নথিতে কোনো ঘোষণা রয়েছে কি না।
৮. এসব তথ্য তাঁর পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় ছিল কি না।
বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা
বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদন এবং অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর নাগরিকত্ব/স্থায়ী বসবাসসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থান পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
শেষ কথা
বেইলি রোডের ৪৬টি প্রাণ কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সেই ভবনের নকশা অনুমোদন থেকে নির্মাণ, ব্যবহার, তদারকি এবং অগ্নিনিরাপত্তা—প্রতিটি ধাপের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিদেশি নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের বিষয়েও অনুমান নয়, প্রয়োজন সরকারি নথি ও আইনগত যাচাই।
তাই প্রশ্নটি কাউকে আগেই দোষী সাব্যস্ত করার নয়; বরং প্রশ্ন হলো—বেইলি রোডের সেই ভবনের অনুমোদন থেকে শুরু করে একজন কর্মকর্তার পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থান এবং বিদেশে তাঁর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।
পরবর্তী পর্বে থাকছে:
প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার পর বদলি-পদায়ন, টেন্ডার ও কথিত প্রভাবশালী বলয়—কোন নথিতে কী আছে?