মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প গুলোতে কোনো ধরনের অনুমোদন, লাইসেন্স বা ড্রাগ সার্টিফিকেটের তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক অবৈধ ফার্মেসি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ছাড়াই এসব দোকানের কর্মচারীরা বনে গেছেন ‘বড় ডাক্তার’। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু করে টেকনাফের মোছনি জাদিমুড়া ক্যাম্প পর্যন্ত বিস্তৃত ভাবে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ ওষুধের দোকান। ভিতরে ঢুকতে দেখা যায় একেকটি ফার্মেসী যেন ‘মিনি হাসপাতালে পরিণত হয়েছে, যা ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার স্বাস্থ্যসেবাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে ।
সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা যায় উখিয়ার কুতুপালং, লম্বাশিয়া, বালুখালী, (বলি বাজার), ফুটবল খেলার মাঠ এলাকা, মরা গাছতলা, থাইংখালী সেনাবাহিনীর রাস্তার মাথা, ময়নারঘোনা, জামতলী ক্যাম্প এবং পালংখালী চাকমারকুল মোছনী জাদীমুরা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ব্লকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে এসব অবৈধ দোকান। ক্যাম্পের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের অলিগলিতেও এখন ওষুধের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য।
(যার কোনোটিরই ড্রাগ লাইসেন্স নেই)।
কোনো ফার্মাসিস্ট বা রেজিস্টার্ড ডাক্তার নেই সাধারণ রোহিঙ্গা যুবকেরাই এখানে প্রেসক্রিপশন লিখছেন নিজের মত করে ঔষধ দিচ্ছেন। তাতে উপকার থেকে ক্ষতির প্রবণতা বেড়ে ছোট রোগ থেকে বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে ।
মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল, নিষিদ্ধ এবং নিম্নমানের ওষুধ দিয়ে স্বাস্থ্য ঝুকিতে ফেলছে এমন অভিযোগ শতভাগ। শুধু ওষুধ বিক্রিই নয়, অবৈধভাবে আইভি ফ্লুইড (স্যালাইন), উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ও দেওয়া হচ্ছে।
ক্যাম্পের এসব দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ছোট ছোট কেবিন বা পর্দার আড়ালে রোগীদের স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে, করা হচ্ছে ইনজেকশন পুশ। এমনকি ছোটখাটো কাটা ছেঁড়ার ড্রেসিং এবং অস্ত্রোপচারও করছেন এই স্বঘোষিত চিকিৎসকেরা। কোনো রকম প্যাথলজিক্যাল টেস্ট ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক এবং নিষিদ্ধ স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ নির্বিঘ্নে দেওয়া হচ্ছে অসহায় রোহিঙ্গাদের।
মেডিকেল সায়েন্সের কোনো মৌলিক জ্ঞান না থাকায় সামান্য সর্দি-কাশির জন্যও রোগীদের হাই-ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ক্যাম্পের মানুষের মধ্যে ভয়াবহ ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে মহামারি রূপ নিতে পারে।
এইসব অপকর্মে জড়িত বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির কর্মচারী তাদের নামের ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে রোহিঙ্গাদের সুবিধা করে দেওয়ার তথ্য সবার মুখে মুখে। স্থানীয় কিছু অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ী এবং ক্যাম্পের প্রভাবশালী চক্রের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন পাইকারি বাজার থেকে এসব ওষুধ অননুমোদিতভাবে ক্যাম্পে প্রবেশ করছে। নিয়মনীতি না মেনে সাধারণ তাপমাত্রায় ও নোংরা পরিবেশে ওষুধ সংরক্ষণের ফলে জীবনরক্ষাকারী এসব ড্রাগ উল্টো বিষে পরিণত হচ্ছে।
ক্যাম্পে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা (NGO/INGO)-র ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং হাসপাতাল থাকলেও, সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা এবং অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ওষুধ না পাওয়ার অজুহাতে সাধারণ রোহিঙ্গারা এসব অবৈধ ফার্মেসির দিকে ঝুঁকছে। আর এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় সচেতন মহলের দাবী রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলো এখন সবদিকে অনিরাপদ। অবিলম্বে ড্রাগ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা (APBN)- পুলিশ এর যৌথ সমন্বয়ে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা চিরুনি অভিযান চালানো দরকার।
ক্যাম্পের ভেতরের এসব অবৈধ ফার্মেসি সিলগালা করার পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর সেবার মান ও ওষুধের সরবরাহ আরও বাড়াতে হবে। তা না হলে এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরো কক্সবাজার অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।