৪ হাজার ৫০০ গ্রাহকের আমানত ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ, পরিচালকের কক্ষ ঘেরাও, এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা ডায়াবেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল ও নলতা ডায়াবেটিস হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ। ফ্রি চিকিৎসা, অধিক মুনাফা এবং মাত্র ছয় বছরে আমানতের টাকা দ্বিগুণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকার বেশি আমানত সংগ্রহের পর তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
দীর্ঘদিন ধরে আমানত ও লভ্যাংশ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন শত শত গ্রাহক। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (১০ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নলতা ডায়াবেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা। একপর্যায়ে তারা হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেনের কক্ষ ঘেরাও করে টাকা ফেরতের দাবি জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর নলতা ডায়াবেটিক হাসপাতাল কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়। পরে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহক সংগ্রহ করে আমানত নেওয়া শুরু হয়। ছয় বছরে দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়াসহ নানা সুবিধার কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
গ্রাহকদের দাবি, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও আমানতের টাকা ও লভ্যাংশ না পাওয়ায় অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। এমনকি অসুস্থতা ও চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও নিজেদের জমা রাখা টাকা না পাওয়ায় অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
বিক্ষোভ চলাকালে হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেন সাংবাদিকদের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। তবে এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে তিনি নিজ কার্যালয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা তার কক্ষ ঘেরাও করে টাকা ফেরতের দাবিতে অবস্থান নেন।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলার পর পরিচালক মিলন হোসেন প্রতি মাসে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে গ্রাহকদের ৩০ হাজার টাকা করে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন বলে জানা গেছে। তবে গ্রাহকরা এতে সন্তুষ্ট না হয়ে তাদের সম্পূর্ণ আমানত ফেরতের দাবিতে অনড় থাকেন।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন মাঠকর্মী চম্পা সরকার, আমেনা খাতুন, ফিরোজা বেগম, আবেদার আলী খান, আশরাফ হোসেন, প্রভাতী রানীসহ আরও অনেকে।
মাঠকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, “গ্রাহকরা আমাদের ওপর আস্থা রেখেই টাকা জমা দিয়েছেন। আমরা তাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেছি। এখন গ্রাহকরা পরিচালনা কর্তৃপক্ষের কাউকে চেনেন না, আমাদের কাছেই টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিচ্ছেন। সময়-অসময়ে বাড়িতে গিয়ে গ্রাহকদের চাপ, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অথচ মূল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান হচ্ছে না।”
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, প্রায় তিন মাস আগে তারা বিষয়টি নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এদিকে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, সমিতির কার্যক্রম ও গ্রাহকদের আমানতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি থাকলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের আমানতের টাকা ফেরতের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে নলতা ডায়াবেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক মিলন হোসেন বলেন, “আমার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা করে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। কিন্তু তারা সেটি মানছেন না।”
তিনি পরিস্থিতি সমাধানে প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সমিতির নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং সেই অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সমবায় অধিদপ্তরের কার্যকর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন গ্রাহকরা।