ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব
সামনে ৩৫ ই-জিপি টেন্ডার আইডি; OTM-LTM, কমিশন, ভেরিয়েশন, পোস্টিং ও সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে টেন্ডার প্রক্রিয়া, দরপত্র পদ্ধতি, কমিশন, ভেরিয়েশন অনুমোদন, পদায়ন, দায়িত্ব পালনের ধরন এবং সম্পদ নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকাল এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকায় পদায়নের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী তিনি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বগুড়া গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, এপিপিভুক্ত ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের কিছু কাজের ক্ষেত্রে LTM-এর পরিবর্তে OTM পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নির্দিষ্ট ঠিকাদাররা সুবিধা পেয়েছেন এবং কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ জানুয়ারি ও মে ২০২৬-এ প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সামনে ৩৫টি ই-জিপি টেন্ডার আইডি
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে ই-জিপি টেন্ডার আইডিগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—
1111781, 1119316, 1113079, 1111563, 1111558, 1111559, 1111560, 1111570, 1111567, 1111569, 1111561, 1111564, 1111565, 1111566, 1081546, 1100790, 1102028, 1091973, 1091974, 1091975, 1091976, 1091977, 1091978, 1091979, 1082159, 1080235, 1080236, 1069131, 1070874, 1070875, 1070876, 1071265, 1043248, 1029596 ও 1018159।
তবে শুধু আইডি তালিকাভুক্ত থাকলেই কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। এসব টেন্ডারের প্রতিটির ক্ষেত্রে কাজের ধরন, অর্থের উৎস, দরপত্র পদ্ধতি, প্রাক্কলন, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ ও বিল পরিশোধের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অনুসন্ধানের পরবর্তী ধাপে এসব ই-জিপি আইডির পৃথক তথ্য যাচাই করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
OTM পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে এপিপিভুক্ত কিছু কাজের ক্ষেত্রে প্রচলিত LTM পদ্ধতির পরিবর্তে OTM পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ ও কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ ও এপিপিভুক্ত কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কাজের বিপরীতে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
তাই প্রশ্ন উঠেছে—কোন কাজের ক্ষেত্রে কেন LTM-এর পরিবর্তে OTM বেছে নেওয়া হয়েছিল, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং দরপত্রের ফলাফল কী হয়েছিল?
কমিশন নেওয়ার অভিযোগ
আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে টেন্ডারের টেকনিক্যাল অনুমোদন, প্রাক্কলন অনুমোদন এবং ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এর দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু টেন্ডারের টেকনিক্যাল অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে তাঁর e-GP আইডিতে কিছু টেকনিক্যাল অনুমোদন ঝুলে থাকার দাবিও করা হয়েছে।
অন্যদিকে বগুড়ার দায়িত্বকাল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
দুটি অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট e-GP লগ, অনুমোদনের সময়, নোটশিট, টেকনিক্যাল স্যাংশন এবং কার্যাদেশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ভেরিয়েশন অনুমোদন ঘিরে অভিযোগ
শুধু টেন্ডার নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ভেরিয়েশন অনুমোদন নিয়েও আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজের পরিমাণ ও ব্যয় পরিবর্তনের অনুমোদনকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগ যাচাই করতে মূল প্রাক্কলন, সংশোধিত প্রাক্কলন, ভেরিয়েশনের কারণ, অনুমোদনের নথি, কাজের পরিমাণ এবং ঠিকাদারদের বিল পাশাপাশি পরীক্ষা করা জরুরি।
ঢাকায় পদায়ন ঘিরে বড় অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ
আবু নাসের চৌধুরীর ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২-এ পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ্যে এসেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বদলি ও পদায়নের আদেশ, জ্যেষ্ঠতা তালিকা, প্রশাসনিক প্রস্তাব, অনুমোদনের ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বগুড়ায় অফিসে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন
বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে আবু নাসের চৌধুরী নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকতেন না এবং সপ্তাহে সীমিত সময় বগুড়ায় অবস্থান করতেন। তাঁর উপস্থিতি যাচাই করতে হাজিরা রেজিস্টার, মুভমেন্ট রেজিস্টার, সরকারি গাড়ির লগবুক এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি করা হয়েছে।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
আগের কর্মস্থল নিয়েও অনুসন্ধানের দাবি
প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর আগের কর্মস্থল গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও টেন্ডার, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
তাই শুধু বগুড়া বা বর্তমান ঢাকা সার্কেল নয়, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলগুলোর দায়িত্বকালীন টেন্ডার, প্রকল্প, ভেরিয়েশন ও আর্থিক সিদ্ধান্তও অনুসন্ধানের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
সম্পদ নিয়ে বড় প্রশ্ন
আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে নামে ও বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুর, বারিধারা ও গুলশান-২ এলাকায় ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরে প্রায় ২০ একর জমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরা ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকার দাবিও করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও বৈধতা যাচাই করা হয়নি বলে সেগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, ব্যাংক হিসাব এবং বৈধ আয়ের উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।
আত্মীয়তার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন
কয়েকটি প্রতিবেদনে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির সঙ্গে আবু নাসের চৌধুরীর আত্মীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। তদন্তের বিষয় হতে পারে—এই সম্পর্ক কোনো পদায়ন, টেন্ডার অনুমোদন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবে প্রভাব ফেলেছিল কি না।
‘কোনো টেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত নই’—আবু নাসের
এদিকে দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি টেন্ডার-সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তাঁর বক্তব্য, “আমি কোনো টেন্ডারের সঙ্গে যুক্ত নই।”
তাঁর এই বক্তব্য প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হলো। এখন উল্লিখিত ই-জিপি টেন্ডার আইডিগুলোর সরকারি রেকর্ড, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হলে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে নথিপত্রের সামঞ্জস্যও যাচাই করা সম্ভব হবে।
দুদকসহ তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান জরুরি
আবু নাসের চৌধুরীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলো একই সঙ্গে টেন্ডার, কমিশন, ভেরিয়েশন, পদায়ন, দায়িত্ব পালনের ধরন ও সম্পদ—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রমকে স্পর্শ করছে।
এ কারণে অভিযোগগুলোকে শুধু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের পৃথক বা সমন্বিত তদন্তের দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে উল্লিখিত ৩৫টি ই-জিপি টেন্ডার আইডির প্রতিটির দরপত্র পদ্ধতি, প্রাক্কলন, অনুমোদন, টেকনিক্যাল স্যাংশন, দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, ভেরিয়েশন, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে তাঁর সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাই করতে দুদকের অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, ভূমি রেজিস্ট্রি ও আয়কর নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করা—উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব।
পরবর্তী পর্বে: উল্লিখিত ৩৫টি ই-জিপি টেন্ডার আইডির মধ্যে কোনটি কোন প্রকল্পের, প্রাক্কলিত ব্যয় কত, কোন পদ্ধতিতে দরপত্র হয়েছে, কারা অংশ নিয়েছে, কারা কার্যাদেশ পেয়েছে এবং অনুমোদনের কোন পর্যায়ে আবু নাসের চৌধুরীর ভূমিকা ছিল—এসব নথি ও তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চলবে।
চলবে…