(প্রথম পর্ব)
সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী মুক্তাদিরের আপন ভাগ্নি পরিচয়ে ৪৯ জন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে পরিচালক (উপকরণ ও সংগ্রহ) পদে চলতি দায়িত্ব; ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, স্বামীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতিষ্ঠানে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার প্রশ্ন!!
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাকিয়া আক্তারকে ঘিরে পদোন্নতি, প্রশাসনিক প্রভাব, সরকারি কার্যাদেশ এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী মুক্তাদিরের আপন ভাগ্নি পরিচয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে জাকিয়া আক্তার গুরুত্বপূর্ণ পদে সুবিধা পেয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪৯ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তাঁকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সংগ্রহ) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতসংখ্যক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে কীভাবে তিনি ওই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
জাকিয়া আক্তারকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো শেষ হয়নি বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি। সূত্রটির ভাষ্য, অদৃশ্য শক্তির প্রভাবের কারণে তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, কেন তা শেষ হচ্ছে না এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
জাকিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশে তৎকালীন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক ছাত্রলীগের উত্তর মহানগর সভাপতি সৈয়দ মিজান এবং বিপ্লব, সাগরসহ কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল।
অভিযোগকারীরা এসব ব্যক্তিকে ছাত্রলীগের ক্যাডার ও সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই রাজনৈতিক যোগাযোগ সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছিল কি না। যদি করে থাকে, তাহলে কোন কোন সিদ্ধান্তে এর প্রভাব পড়েছিল এবং কারা এর মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছিল, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বামীর বেনামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন
জাকিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তাঁর স্বামীর বেনামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসহ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা বিভিন্ন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে সরকারি কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও সরকারি কাজ পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাকিয়া আক্তারের পদ ও প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, দরপত্রে অংশগ্রহণ, কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা, দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং বিল পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশের পরও তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
জাকিয়া আক্তারকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, সরকারি ক্রয় ও কার্যাদেশসংক্রান্ত অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। এসব অভিযোগ প্রকাশের পরও যদি তদন্ত শেষ না হয়ে থাকে, তাহলে এর নেপথ্যে কী কারণ রয়েছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করা—দুই ক্ষেত্রেই তদন্ত সম্পন্ন করা জরুরি।
জাকিয়া আক্তারের পদোন্নতি, ৪৯ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে চলতি দায়িত্ব পাওয়া, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এবং স্বামীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ পাওয়ার অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সংশ্লিষ্ট সময়ের নথিপত্র পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
এটি ধারাবাহিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব। পরবর্তী পর্বে জাকিয়া আক্তারের দায়িত্ব পালনকালে সরকারি ক্রয়, টেন্ডার, কার্যাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে আরও তথ্য তুলে ধরা হবে।
চলবে…