পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ; বদলি-পদায়ন ও টেন্ডার ঘিরে আর্থিক লেনদেনের প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দীর্ঘ চাকরিজীবন ঘিরে পুরোনো বিভাগীয় শাস্তি থেকে শুরু করে পরবর্তী পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, বদলি-পদায়ন ও সরকারি দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বড় একটি অংশই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দাপ্তরিক নথি ও পদোন্নতির প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারি নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় লঘুদণ্ডের তথ্য রয়েছে। এরপর কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং শেষ পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে আসেন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, বিভাগীয় শাস্তির বিষয়টি পরবর্তী পদোন্নতিতে কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পেছনে ফেলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রশাসনিক যুক্তি অনুসরণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে বদলি ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর ভিত্তি কী—এসব বিষয় এখন নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদেশযাত্রা ও বিভাগীয় মামলা
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে যাওয়া ও প্রেষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কাগজপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিষয়টি গড়ায় বিভাগীয় মামলায়।
তদন্ত শেষে অসদাচরণের অভিযোগে তাঁকে দায়ী করে ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই শাস্তির পর তাঁর চাকরির পরবর্তী অগ্রগতি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে পদোন্নতির সময় বিভাগীয় মামলার তথ্য কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় ছিল কি না, থাকলে কীভাবে তা বিবেচনা করা হয়েছিল—তা জানতে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
এক বছরে দুই গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি
চাকরির রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতির বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ ক্ষেত্রে সে সময়কার জ্যেষ্ঠতা তালিকা, পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ, প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করলেই পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি নিয়মমাফিক ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার বলয়ও বদলেছে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ একটি পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পরিবারের সঙ্গে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এই যোগাযোগও তাঁর প্রশাসনিক অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক বা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি ও প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
জ্যেষ্ঠদের পেছনে ফেলে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পান। পরে তিনি চলতি দায়িত্বে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কয়েকজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে ওই সময়ের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতা এবং দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার প্রচলিত ক্রম কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল।
স্থায়ী পদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
চলতি দায়িত্বের পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলীর পদ নিয়মিত করার প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের নিয়ে প্রস্তুত করা তালিকায় দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার ক্রম যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। একই সঙ্গে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জুলাই-সংক্রান্ত মামলার তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে উপস্থাপনের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এসব ঘটনায় কার নাম কোন ক্রমে ছিল, কোন নথির ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হয়েছে এবং এসএসবিতে কী তথ্য পাঠানো হয়েছে—তা যাচাই করা জরুরি।
৪৭ প্রকৌশলীর নাম নিয়ে বিতর্ক
একটি মামলার নথিতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, মামলার তথ্য পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল করতে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মামলার এজাহার, তদন্তের অবস্থা এবং এসএসবিতে উপস্থাপিত নথি পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন।
মামলায় কার নাম কী কারণে এসেছে এবং সেই তথ্য পদোন্নতি বিবেচনায় কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—এ দুটো বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি-পদায়ন নিয়েও নানা অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে একদিনে অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হলে তা নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে অধিকাংশ বদলি বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ ঘটনায় বদলির প্রস্তাব কে করেছিলেন, কার অনুমোদনে আদেশ জারি হয়েছিল, কী কারণে তা বাতিল হলো এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে বের করা সম্ভব।
বরখাস্ত প্রকৌশলীকে ঘিরে নথির অসঙ্গতি
দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে ঘিরে বদলি আদেশের তারিখ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হলেও এর আগের তারিখে তাঁকে ঢাকার রিজার্ভে বদলি দেখানো একটি আদেশ পরে প্রকাশ করা হয়।
একজন কর্মকর্তার বরখাস্তের আগের তারিখে বদলি আদেশের বিষয়টি কীভাবে তৈরি ও অনুমোদিত হলো এবং সেটি পরে প্রকাশের কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক রেকর্ডেই থাকার কথা।
টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন নিয়েও অভিযোগ
বদলি-পদায়নের পাশাপাশি গণপূর্তের কয়েকটি বড় প্রকল্পের দরপত্র পুনর্মূল্যায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথা উল্লেখ করে কিছু দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানো হলেও এর পেছনে কমিশন বা আর্থিক সুবিধার বিষয়টি কাজ করেছে।
তবে এ অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, পুনর্মূল্যায়নের কারণ, অনুমোদনের ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নতুন প্রভাবশালী বলয়ের অভিযোগ
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের অভিযোগ, নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং নতুন করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে আর্থিকভাবে সুবিধা দিতে সক্ষম ব্যক্তিরাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে শুধু মৌখিক বক্তব্য নয়, বদলি-পদায়নের নথি, টেন্ডার সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকে অভিযোগ
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, পদোন্নতিতে অনিয়ম, বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগের সঙ্গে বিভিন্ন দাপ্তরিক নথি ও তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগগুলো যাচাই হলে এর মাধ্যমে শুধু একজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের পদোন্নতি, বদলি ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও প্রতিবারই তাঁকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুরোনো বিভাগীয় শাস্তি, দ্রুত পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি-পদায়ন এবং টেন্ডার নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠার বিষয়টি এখন প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।
বিশেষ করে বিভাগীয় মামলার নথি, লঘুদণ্ডের আদেশ, পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন, তৎকালীন জ্যেষ্ঠতা তালিকা, এসএসবিতে পাঠানো নথি, বদলি আদেশ এবং টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের কাগজপত্র একসঙ্গে যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।