বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি চরম, অমার্জনীয় এবং সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, এ ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সামাজিক মীমাংসা বা ‘শালিশ’ করার বিন্দুমাত্র আইনি সুযোগ নেই। অথচ ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানাধীন চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে ১১ বছরের এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন (মানসিকভাবে অসুস্থ) শিশুকে ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটানোর পরও দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর আগে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় অবৈধ শালিশ বৈঠক বসিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি রফাদফা করার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হলেও রহস্যজনক কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘটনার পটভূমি ও অবৈধ শালিশের দেওয়াল:
গত ১৫ জুন আনুমানিক দুপুর আড়াইটার দিকে চর নিলক্ষিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে জন্মগতভাবে মানসিকভাবে অসুস্থ ওই শিশুটি বাড়ির পাশে সুপারি কুড়াতে গেলে প্রতিবেশী আইজুল মুন্সি (৭০) কর্তৃক চরম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন মাতব্বর। আইনের তোয়াক্কা না করে ঘটনার দিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগীর নানার বাড়িতে গোপন শালিশ বৈঠক বসানো হয়। স্থানীয় মাতব্বর সাইদুল, সুমন ও মানিকদের নেতৃত্বে বসা ওই অবৈধ শালিশে মূল অভিযুক্ত আইজুল মুন্সিকে আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচাতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয় এবং আগামী সোমবারের মধ্যে সেই টাকা ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে যাতে কেউ মুখ না খোলে, সেজন্য জারি করা হয় মৌখিক নিষেধাজ্ঞা। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সংবাদমাধ্যমে এসব তথ্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হওয়া এবং দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পরও অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় তাদের আনাগোনার গুঞ্জন রয়েছে।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও স্থানীয় পুলিশের দায়:’জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় অবৈধ শালিশ, ৫০ হাজার টাকায় ধর্ষণ ধামাচাপার চেষ্টা এবং সামাজিক অপরাধের চিত্র স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরেও কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা গেল না—তা নিয়ে আজ জনমনে এক বিশাল প্রশ্ন ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্বউদ্যোগে (সুয়োমোটো) মামলা গ্রহণ এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করার কথা থাকলেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি।
ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়া এবং গণমাধ্যমে অপরাধীদের নাম ও শালিশের চিত্র স্পষ্টভাবে আসার পরও তাদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনার পেছনে স্থানীয় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের অভাব ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে যে ধরনের তাৎক্ষণিক ও কঠোর অ্যাকশন নেওয়ার কথা ছিল, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও রহস্যময় নমনীয়তার কারণে তা অনুপস্থিত ছিল। এমনকি অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশি তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত গতি না আসায় আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
আইনের শাসন বনাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইন স্পষ্ট ভাষায় বলে, ধর্ষণের মতো অপরাধে শালিশ বা আপস বসানো এবং তা ধামাচাপা দেওয়া অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ। যারা এই শালিশের সাথে জড়িত, তারাও আইনের চোখে সমান অপরাধী। অথচ প্রকাশিত খবরের পরও যদি অপরাধীরা আইনের নাগালের বাইরে থেকে যায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসে, তবে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। এখন সময় এসেছে কেবল আশ্বাস বা দায়সারা বক্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে ময়মনসিংহের এই ঘটনায় জড়িত মূল অভিযুক্ত এবং অবৈধ শালিশের হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার। সংবাদ প্রকাশের পরও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই দীর্ঘসূত্রিতা ও নিষ্ক্রিয়তার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর ও ত্বরিত হস্তক্ষেপই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।