কথাগুলো কর্কশ শোনাতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য এটি এই দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার প্রসঙ্গ এখন। একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, এটি অন্যায় নয়। কিন্তু সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আর তিনি যদি রাজনীতির নাথে সাংবাদিকতাও করেন তখন পাঠকের মনে সংশয় জন্মাবেই। একবার সন্দেহ জন্মালে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় যে সম্পদ, বিশ্বাস, সেই বিশ্বাস ক্ষয় হতে শুরু করে।
অনেকে বলতে পারেন, পাকিস্তান আমলেও তো এ দেশের অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক ও সম্পাদক রাজনীতি করেছেন। করেছেন ঠিকই। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পাকিস্তান আমলে এ দেশের মানুষ ছিল একটি পরাধীন রাষ্ট্রের অধিবাসী। সেখানে স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল সবার সংগ্রাম। সাংবাদিক, শিক্ষক, সাহিত্যিক, ছাত্র, প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সেই আন্দোলনের অংশ ছিলেন।
কিন্তু আজকের বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। এখন সংগ্রামটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নয়; রাষ্ট্রকে আরও গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক করে তোলার। তাই আজকের সাংবাদিকতার দায়িত্বও ভিন্ন। সাংবাদিকের কাজ কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে মাঠে নামা নয়; বরং সব পক্ষকে সমানভাবে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন করা এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা।
একইভাবে সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজিও একসঙ্গে চলতে পারে না। একটি যুৎসই ক্রাইম নিউজ ক্যামেরায় ধরে এনে সেটি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অনৈতিক কারবার অনুচিৎই না শুধু, সেটি রীতিমত অন্যায়ও বটে। অনেক মিডিয়া হাউজে এটি ওপেন সিক্রেট এখন। নতুন একটা মিডিয়া হাউজ খোলার সাথে সাথে ইনভেস্টিগেটিভ সেল খুলে বসে তারা। অনুসন্ধানের অ-ও জানে না, কিন্তু দাত কেলিয়ে টার্গেট করা লোকদের কাছে করে চাঁদা দাবি!
সাংবাদিকতা করতে চাইলে চাঁদাবাজি ছাড়তে হবে। আর চাঁদাবাজি করতে চাইলে সাংবাদিকতাটা ছাড়তে হবে। দুই নৌকায় পা দিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ এখানে নেই।
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি জনবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সামাজিক দায়িত্ব। একজন চিকিৎসকের হাতে যেমন মানুষের জীবন, একজন বিচারকের হাতে যেমন ন্যায়বিচার, তেমনি একজন সাংবাদিকের হাতে থাকে তথ্যের সততার পতাকা। সেই অবস্থান ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করা বা প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায় করা শুধু অপরাধই নয়, পুরো পেশার মর্যাদাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় হাজারো সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিককে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা। এটি মহামারি আকার নিয়েছে এ দেশে।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, প্রভাব নয়, পরিচয়ও নয়, তার সবচেয়ে বড় শক্তিটা হলো পাঠকের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন।
তাই সময়ের দাবি একটাই:
সাংবাদিকতা করলে রাজনীতি নয়। রাজনীতি করলে সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকতা করলে চাঁদাবাজি নয়। আর চাঁদাবাজি করলে সাংবাদিকতা নয়। যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে। মাস
সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি এ দেশে প্রকৃত সাংবাদিকরা করতে দেবে না।