মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন

(হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সেহ্লী পারভীন বলেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। কয়েক বছর ধরেই এ আস্থাহীনতা বেড়েছে। তবে আস্থাহীনতার কথা বলে কোনো গণপিটুনিকেই সমর্থন করা যায় না। তিনি আরও বলেন, আস্থাহীনতা থাকলেও তা যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ঠিক করা যায়, কিন্তু তা করা হয়নি। এর দায় সরকারের।)
শের ই গুল :
গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হত্যাকারী হিসেবেই চিহ্নিত হন, এমনটাই মত দেন বার কাউন্সিলের ল রিফর্ম কমিটির চেয়ারম্যান কাজী এনায়েত হোসেন বাচ্চু। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি এবং আমলাতন্ত্রকে পরিচালনায় অদক্ষতাই গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ।
কাজী এনায়েত হোসেন বাচ্চু বলছিলেন, ‘গণপিটুনি এখন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো প্রচেষ্টা সরকারিভাবে দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের চাকরি ও বদলি নিয়ে তটস্থ। আমলাতন্ত্র পরিচালনাও যথাযথ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলছি না যে প্রশাসনের যেসব অপরাধী আছে, তাদের বিচার করা যাবে না। কিন্তু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার এমন দুরাবস্থা থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।’
বুধবার রাজধানী জুরাইন পোস্তগোলায় ছিনতাইকারী ধরে মারধর করে বিবস্ত্র করে বিদ্যুতের খুটির সাথে বেঁধে জনসাধারণের উল্লাস। মঙ্গলবার রাতে ঘটে গণপিটুনির দুটি ঘটনা। একটি রাজধানীর উত্তরায়, অন্যটি রাজধানী লাগোয়া গাজীপুরের টঙ্গীতে। দুটি ঘটনাতেই ‘ছিনতাইকারী’ সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে স্থানীয় লোকজন দলবদ্ধ হয়ে পেটানো শুরু করেন।
উত্তরায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে আহত করার পর পায়ে দড়ি বেঁধে পদচারীসেতুর সঙ্গে তাঁদের উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এই ব্যক্তিরা হলেন মো. নাজিম (৪০) ও মো. বকুল (৩০)।
রাত ১০টার দিকে উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকার বিএনএস সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
উত্তরার ঘটনায় কারও প্রাণ যায়নি। কিন্তু টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে নিহত ওই যুবকের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেনি পুলিশ।
দুটি ঘটনাই বীভৎস। আর এসব ঘটনা বা পিটুনির ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েও দেওয়া হয়। উত্তরার ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন এক ব্যক্তিকে ওপরে তুলছেন। তাঁর পায়ে দড়ি বাঁধা। তাঁকে পদচারী সেতুর লোহার খুঁটির সঙ্গে উল্টো করে বাঁধছিলেন হলুদ রঙের টি-শার্ট পরা এক যুবক। আরও কয়েকজন ওই ব্যক্তিকে ওপরে তুলছিলেন।
এই নির্বিচার গণপিটুনি এবং তাতে হত্যা বাড়ছেই। একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে বিগত ছয় মাসে এ ধরনের গণপিটুনির ঘটনা ও নিহত মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্রকেই তুলে ধরে। দিনের পর দিন এসব ঘটনা বাড়লেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করছেন এসব ব্যক্তি।
হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সেহ্লী পারভীন প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, গণপিটুনি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার চিত্র তুলে ধরে। কয়েক বছর ধরেই এ আস্থাহীনতা বেড়েছে। তবে আস্থাহীনতার কথা বলে কোনো গণপিটুনিকেই সমর্থন করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, আস্থাহীনতা থাকলেও তা যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে ঠিক করা যায়, কিন্তু তা করা হয়নি। এর দায় সরকারের।
কত মৃত্যু
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের (২০২৪) আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ১২১ জন নিহত হয়েছেন।
আরেক মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে গণপিটুনিতে সর্বোচ্চ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৪৬ জন, যা আগের বছরের প্রায় তিন গুণ। ২০২৩ সালে নিহত হয়েছিলেন ৫১ জন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত ৫ আগস্টের পর ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সরকার তা বন্ধ করতে তেমন পদক্ষেপ নেয়নি। কখনো কখনো কাউকে জোর করে কোনো পদ থেকে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে ‘মবের’ সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই বেড়েছে এসব মবকেন্দ্রিক সহিংসতা বা গণপিটুনি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গণপিটুনির মতো এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে তিনটি কারণ আছে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমত, এটি ঘটছে পরিকল্পিত উসকানির কারণে। সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তি এতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা একটা বড় কারণ। হয়তো ইচ্ছা করেই এ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। সর্বোপরি সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণেই বেড়ে যাচ্ছে গণপিটুনির প্রবণতা।
গণপিটুনি আইনের দৃষ্টিতে ‘হত্যা’
উত্তরা ও টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনার সঙ্গে অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের অতিষ্ঠ হয়ে পড়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। পুলিশের তথ্য বলছে, ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার (ছিনতাই) ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪৫টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
ডাকাতি ও দস্যুতা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আরও বেড়েছে। দেশে গত জানুয়ারিতে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের শিকার হওয়ার আতঙ্ক থেকে মানুষ আইন হাতে তুলে নিতে পারে। সেটা ঠেকাতে অপরাধ দমাতে হবে। আবার যাঁরা আইন হাতে তুলে নেন, তাঁদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
‘দুয়েকটি’ ঘটনা ঘিরে ঢাকাবাসীর মনে সৃষ্টি হওয়া ‘নিরাপত্তাহীনতা’ ঘোচাতে জোরদার করা পুলিশি কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে নিজেদের ‘আরো অ্যাকটিভ’ বলে দাবি করেছেন ঢাকার পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
তিনি বলেছেন, “ঢাকা শহরে ছিনতাইয়ের প্রবণতা একটু বৃদ্ধি পাওয়ায়, এবং দুই একটি ঘটনা ভাইরাল হওয়ায় আমরা ছিনতাইকারী এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যপক অভিযান শুরু করেছি।”
ঢাকার পুলিশ প্রধানের ভাষ্য, “একটা ঘটনা যখন হয়, সমাজে একটা প্যানিক সৃষ্টি হয়, যা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতেছে। এটা থেকে মানুষকে বের করে আনার জন্য আমরা আরো বেশি অ্যাকটিভ।”
মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকার বিজয়সরণি এলাকার তল্লাশিচৌকি পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সাজ্জাত আলী।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে ছিনতাইকারীদের ধরা এবং তাদেরকে দমন করার জন্য আমাদের ডিএমপির সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, এপিবিএন, এটিইউ সকল এজেন্সি যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। এর আগে আমরা যৌথভাবে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করি। আজকে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, সকল এজেন্সি মিলিয়ে এটার প্রধান উদ্দেশ্য ছিনতাইকারীদের দমন করা।”
ছিনতাইকারীদের ধরতে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় মঙ্গলবার যৌথবাহিনীর ‘ব্লকরেইড’ দিয়েছে বলে জানান ডিএমপিস কমিশনার।
তিনি বলেন, “চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা করে সেই মোতাবেক আমাদের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নেই যে আমরা যে কোনো মানুষকে অ্যারেস্ট করে কোর্টে সোপর্দ করি। আমাদের চিহ্নিত ছিনতাইকারী যারা আছে, তাদেরকেই শুধু অ্যারেস্ট করব।”
মঙ্গলবার রাতে সেনা সদস্যদের সহায়তায় ঢাকায় ৬৫টি চেকপোস্ট পরিচালনার তথ্য দিয়ে সাজ্জাত আলী বলেন, “ঢাকায় ‘ক্রাইম এগেইনস্ট প্রপার্টি’ বলতে সবচেয়ে সহজ ছিনতাই করা। এত অলি-গলির মধ্যে ছিনতাইকারী এক-দুইজন মিলে চাপাতিটা ধরে ছিনতাই করে দিল।
“ডাকাতির শঙ্কা নাই, অন্য অপরাধেরও শঙ্কা নাই। তবে পরিস্থিতি দুই তিন দিন ধরে একটু খারাপ। তার আগে প্রায় মাসখানেক ছিনতাইয়ের ঘটনা খুবই কম ছিল।”
বর্তমানে কোথাও কিছু ঘটলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “এখানে একটি ঘটনা ঘটলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। অপরাধ যে কখনো ছিল না, তা তো না। কিন্তু তখন যেহেতু মিডিয়া এত অ্যাডভান্স ছিল না, সেজন্য প্রচারটা হত না।
“এখন একটা ঘটনা ঘটার সাথে সাথে একজন ভিডিও করে। ইভেন আগে যে একটা ঘটনা ঘটলে একজন সামনে আগায়ে এসে প্রতিরোধের চেষ্টা করত, এখন সেটা না করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভিডিওতে ব্যস্ত। ওই লোকটা যে বিপদে পড়ছে, আগায়ে না গিয়ে ভিডিও করে।”
সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এত জনবহুল একটা শহর, এখানে সবাইকেই অবদান রাখতে হবে। ঢাকাবাসীর সবার কাছে অনুরোধ, সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আমরা চেষ্টা করি, এ থেকে বের হয়ে আসব।
“এত ঘনবসতির একটা চাঁনমিয়া হাউজিং, অথবা ঢাকা উদ্যানই ধরেন। কী পরিমাণ গলি ঢাকা উদ্যানে আছে। এত এত ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির লোক কি সরকারের আছে? সেটাতো নাই। প্রত্যেক গলিতে লোক দিতে পারব না।”
তিনি বলেন, “আমরা মনিটরিং সিস্টেম বের করছি, আরো টেকনোলজি বের করতেছি। ইনশাল্লা সব জায়গা কাভার করব। আমরা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের যদি আটকাতে পারি, তাহলে দেখবেন ঘটনা কমে গেছে।”
তবে সহায়তার মানে ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়’ মন্তব্য করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “আমি কোনোভাবেই ঢাকাবাসীকে আইন হাতে তুলে নিতে বলছি না। আমরা সম্মিলিতভাবে একটা প্রতিরোধ সৃষ্টি করি। আমরা যে বিভিন্ন ল এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি আছি। কাউকে পেলে আপনারা আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেব। নিজেরা কেউ যেন আইন হাতে তুলে না নেয়।”