নরসিংদীর মনোহরদীতে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যার পর পৌর শহরের বাইপাস সড়কে অবস্থিত মনোহরদী ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হাসপাতালটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।
এ ঘটনায় নিহত রোগীর নাম আকলিমা বেগম (৩২)। তিনি মনোহরদী উপজেলার বড়চাপা ইউনিয়নের বীর মাইজদিয়া এলাকার কবির হোসেনের স্ত্রী।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেলে পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের জন্য আকলিমা বেগমকে মনোহরদী ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালের চিকিৎসক রাহাত বিন কাশেম তাঁর অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ আগস্ট বুধবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। পরে ঢাকার পপুলার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ আগস্ট শুক্রবার রাত ২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
রোগীর মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সন্ধ্যার দিকে তাঁর স্বজন ও বিক্ষুব্ধ জনতা মনোহরদী ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ভাঙচুর চালান। এ সময় হাসপাতালের নিচতলাসহ তিনটি ফ্লোরের বিভিন্ন অংশে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। বিক্ষুব্ধরা চিকিৎসকের বিচার ও হাসপাতাল বন্ধের দাবি জানান।
নিহত আকলিমা বেগমের এক স্বজন অভিযোগ করে বলেন, পিত্তথলিতে টিউমার ধরা পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক রাহাত বিন কাশেম অস্ত্রোপচার করার পরদিন থেকেই তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখার পর বুধবার তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। স্বজনের দাবি, চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তবে হাসপাতাল ভাঙচুরের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নিহতের ভাই নাসির। তিনি বলেন, আমরা ঢাকায় রোগীর চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হাসপাতালটি কে বা কারা ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।
হাসপাতালের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, যে চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেছেন, তিনি অভিজ্ঞ। অস্ত্রোপচারও নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। পরবর্তীতে রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হওয়ায় তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হঠাৎ করেই কিছু লোকজন হাসপাতালে হামলা চালিয়ে চিকিৎসকের চেম্বার, রিসেপশন, ল্যাবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ সময় কর্তব্যরত কয়েকজন স্টাফকেও মারধর করা হয়েছে।
মনোহরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর বাদশা বলেন, হাসপাতালে ভাঙচুরের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মনোহরদী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সজিব মিয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাসপাতালটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এদিকে রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদীর জেলা সিভিল সার্জন ডা. বুলবুল কবির। তিনি বলেন, শনিবার দুপুরে আমরা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছি। ঘটনার বিষয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর রোগীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।