শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনার শেষ প্রান্তের উপজেলা কয়রা। নদী, বন আর লবণাক্ত মাটির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জনপদ হয়েও কয়রা তার ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আজও অনন্য।
কয়রার দক্ষিণে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। আংটিহারা, কাশিয়াবাদ, কপোতাক্ষ আর শাকবাড়িয়া নদী ঘেরা এই উপজেলা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, আর কুমিরের আবাসস্থল। পর্যটকদের কাছে কয়রা এখন সুন্দরবন ভ্রমণের অন্যতম প্রধান রুট। কয়রা সদর থেকে ঘন্টাখানেক গেলেই দেখা মেলে বনের কোল ঘেঁষা কেওড়া-গরান-সুন্দরীর সারি।
ইতিহাসের সাক্ষী মসজিদকুঁড়*
কয়রার আমাদি ইউনিয়নে আছে ৫৫০ বছরের পুরনো মসজিদকুঁড় মসজিদ। সুলতানি আমলের এই এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি লাল ইট আর টেরাকোটার কারুকাজে সমৃদ্ধ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কোনো এক দরবেশের অলৌকিক ক্ষমতায় এক রাতেই এটি তৈরি হয়েছিল।
আইলা, আম্পান, ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কয়রার মানুষ হার মানেনি। নোনা পানিতে চিংড়ি চাষ, সুন্দরবনে মাছ কাঁকড়া মধু আহরণ আর গোলপাতা সংগ্রহ এখানকার প্রধান জীবিকা। নবান্ন উৎসব, পহেলা বৈশাখ আর রাসমেলায় এখনো বাউল গান, পালাগান আর জারি-সারিতে মুখর হয় গ্রাম। বাঘবিধবা পল্লীর নারীরা নকশিকাঁথা আর মাটির কাজে ফুটিয়ে তোলেন সংগ্রামের গল্প।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়রায় ইকো-ট্যুরিজম বিকশিত হচ্ছে। কমিউনিটি ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয়রা হোমস্টে চালু করেছেন। বর্ষায় কপোতাক্ষের তীরে কাশবন, শীতে অতিথি পাখির কলকাকলি আর সারা বছর জোয়ার-ভাটার খেলা দেখতে ভিড় করছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
৫নং কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাস্টার আনিসুর রহমান জানান কয়রার সুন্দরবন-ঘেঁষা এই উপজেলায় বড় কোনো প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ না থাকলেও, কয়েকশ বছরের পুরনো কিছু জায়গা আছে যেগুলো এখনো দেখার মতো।
আমাদি ইউনিয়ন রয়েছে পুরাতন“মসজিদকুঁড়”।
ইতিহাসে*সবচেয়ে পুরানো মসজিদ যা দেখার মত একটি মসজিদ। পাশে কপোতাক্ষ নদী বয়ে গেছে,ইটের তৈরি এক গম্বুজ মসজিদ, নিরিবিলি পরিবেশ।
কপোতাক্ষ নদের পাড় ও পুরনো ঘাট*
কয়রার বুক চিরে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদ শত শত বছর ধরে এখানকার জীবনরেখা। নদীর পাড়ে এখনো ব্রিটিশ আমলের কিছু পুরনো ঘাট, ইটের স্থাপনার ভগ্নাংশ দেখা যায়। বর্ষায় নদী আর সুন্দরবনের কম্বিনেশনটা অসাধারণ।
সুন্দরবন সংলগ্ন পুরনো গ্রাম ও মাটির রাস্তা
শত বছরের পুরনো গ্রাম মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, বাগালী—এসব এলাকায় এখনো মাটির রাস্তা, টিন-কাঠের পুরনো ঘর, আর পুকুরপাড়ে প্রাচীন বট-পাকুড় গাছ আছে। এগুলোই কয়রার লোকজ সৌন্দর্য।
আমাদি, বাগালী, মহারাজপুর এলাকায় কিছু পুরনো কালীমন্দির আর জমিদার আমলের দিঘি আছে।
ব্রিটিশ আমলের কয়রা সদর ও আশপাশে কয়েকটা নীলকুঠির ভিটা এখনো আছে। ইটের ভাঙা দেয়াল, শান বাঁধানো পুকুরঘাট
সবচেয়ে বড় পুরাতন সৌন্দর্য হলো সুন্দরবন নিজেই। কয়রা থেকে সরাসরি সুন্দরবনে ঢোকা যায়। কয়েকশ বছরের পুরনো সুন্দরী, গেওয়া, গরান গাছ, জোয়ার-ভাটার খাল—প্রকৃতির আদিম রূপটা এখানে ধরা দেয়। এবং খুব সহজে খুলনা শহর থেকে বাস বা প্রাইভেটকার ও বাইকযোগে সরাসরি ৩ ঘন্টায় কয়রায় আসা যায়। তারপর কাটকাটা বা ৪নং কয়রা লঞ্জঘাট থেকে বোট ভাড়া করে সরাসরি সুন্দরবনের গহীনে অপরুপ প্রাকৃতিক দৃশ্যে হারিয়ে যাওয়া যাওয়ার সুযোগ আছে।
প্রকৃতি আর ইতিহাসের এমন মেলবন্ধনই কয়রাকে আলাদা করেছে। নদী ভাঙন আর জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ থাকলেও সুন্দরবনের এই জনপদ তার শেকড় আর সৌন্দর্য আঁকড়ে ধরে আগামীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।