শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন
ময়মনসিংহে (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়কে কেন্দ্র করে কমিশন বাণিজ্য,অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার,ভুক্তভোগী ও অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের কাছ থেকে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য,অডিও বক্তব্য এবং বিল সংক্রান্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—প্রকল্পের বিল ছাড়ে নির্দিষ্ট হারে কমিশন আদায়, সাইট পরিদর্শনে অনিয়ম এবং বিভিন্ন স্তরে অর্থ লেনদেনের একটি দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে,যা দীর্ঘদিন ধরেই আড়ালে থেকে গেছে। বিল ছাড়ে ‘৩% পার্সেন্টিজ’—প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে অভিযোগ! একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ,নির্মাণ ও মেরামত প্রকল্পের বিল ছাড়ের আগে প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কমিশন হিসেবে দিতে বাধ্য করা হয়। এই অর্থ প্রদান না করলে বিল প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, ফাইল আটকে রাখা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়,এই কমিশন আদায়ের প্রক্রিয়া অনানুষ্ঠানিক হলেও একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়,যেখানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে তা বণ্টন করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে যে,ঠিকাদারদের অনেকেই এটিকে “অঘোষিত নিয়ম” হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সাইট পরিদর্শনে অনিয়ম: উপস্থিতি ছাড়াই ইতিবাচক প্রতিবেদন! প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—সাইট পরিদর্শন নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী,নির্ধারিত অর্থ প্রদান করলে অনেক ক্ষেত্রে সরেজমিনে উপস্থিত না হয়েই ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়
বিপরীতে,অর্থ লেনদেন না হলে মানসম্মত কাজেও নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়ে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়
এতে করে শুধু প্রকল্পের মান নয়, সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতাও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
NOA,চুক্তিপত্র ও ফাইল যাচাইয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি! অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে—নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) ও চুক্তিপত্র সম্পাদনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়! বিল ফাইল যাচাইয়ের সময় প্রতিটি ফাইলে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে!
প্রকল্পের ব্যয় যত বড়, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণও তত বেশি
এতে করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াই একটি আর্থিক চাপে পরিচালিত অনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অনিয়ম: অতিরিক্ত অর্থ না দিলে জটিলতা! প্রকল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি—বিশেষ করে রোলার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের দাবি,সরকারি নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পেতে বিলম্ব বা বাধা সৃষ্টি করা হয়। নীরবতার সংস্কৃতি: ভয়,চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কা! অভ্যন্তরীণ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ গুলোর সত্যতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য—অভিযোগ প্রকাশ পেলে প্রশাসনিক চাপ,বদলি কিংবা ব্যক্তিগত হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে, ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। নির্বাহী প্রকৌশলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন! অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর ভূমিকা। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে,অ্যাকাউন্টেন্ট শহিদুল ইসলাম নির্বাহী প্রকৌশলীর অলিখিত নির্দেশে বিল ছাড়ে ‘৩% পার্সেন্টিজ’ আদায় করেন—এমন অভিযোগ একাধিক পক্ষ থেকে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া—অভিযোগ চাপা পড়ার আশঙ্কা! সংশ্লিষ্টদের দাবি,অভিযুক্তদের একটি অংশ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অতীতেও অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে তদন্ত হয়নি। ফলে একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।জরুরি তদন্তের দাবি: হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহলের জোর দাবি—দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন,তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের সাময়িক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি,পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা,
বিশেষজ্ঞদের মতে,সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অনিয়ম অব্যাহত থাকলে তা জনস্বার্থ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ পরিণতি!ময়মনসিংহের এলজিইডিকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো যদি নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হয়,তবে তা কেবল একটি দপ্তরের অনিয়ম নয়—
বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যবস্থার ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির গভীর সংকেত বহন করে। এখন দেখার বিষয়—সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়,সচিবালয় ও হাইকমান্ড কত দ্রুত,কতটা গুরুত্ব দিয়ে এই অভিযোগ আমলে নেয় এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ,
এখনই ব্যবস্থা না নিলে—“৩% কমিশন” সংস্কৃতি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।