শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন
এনটিসি’র সাবেক ডিজিএম সামসুল ইসলাম ও সাবেক ম্যানেজার মাহবুবুল আশরাফ চাকরি ফিরে পেতে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করেন। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, সেই মামলায় এখনো পর্যন্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) কোনো জবাবই দাখিল করেনি।
প্রশ্ন হচ্ছে—যেখানে মামলা বিচারাধীন, সেখানে কোন ক্ষমতা বা প্রভাবের জোরে এনটিসি এই দুই ব্যক্তিকে পুনঃনিয়োগ দিল? এটি শুধু আইন ও নীতিমালার প্রতি অবজ্ঞাই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত কি কোনো বিশেষ মহলের চাপ বা অনৈতিক সুবিধার ফল? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া? বিষয়টি এখনই তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য—ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড-এ আবারও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অভিযোগ উঠেছে। হাইকোর্টে দায়ের করা রিট মামলা নং ১০৮৪১/২৩ ও ৯৯৪৯/২৩-এর আবেদনকারী দুই ব্যক্তিকেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল আহসান পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই সরাসরি পুনঃনিয়োগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিয়োগপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে কোথাও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বা অনুমোদনের উল্লেখ নেই। যা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, ২৩ লাখ টাকার চা চুরির অভিযোগে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা দেওয়ান বাহাউদ্দীন আহমেদ-কে পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের নির্দিষ্ট সভা, তারিখ ও সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল। এই দুই ঘটনার মধ্যে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
এ পরিস্থিতিতে এমডি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের
বিচারাধীন রিট মামলা চলাকালে পুনঃনিয়োগ: আইন কী বলে?
ন্যাশনাল টি কোম্পানির মতো একটি সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি বা ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে বরখাস্ত করা হলে—পরবর্তীতে সেই বিষয়ে যদি আদালতে মামলা চলমান থাকে, তখন পুনঃনিয়োগের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
১. Sub Judice (বিচারাধীন) নীতির লঙ্ঘন
যখন কোনো বিষয় আদালতে বিচারাধীন থাকে (রিট বা ফৌজদারি মামলা), রিট মামলা নং ৯৯৪৯/২৩ ও ১০৮৪১/২৩ চলমান। তখন
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়
আদালতের রায়ের আগে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে
মামলা চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্তদের পুনঃনিয়োগ আদালতের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার শামিল হতে পারে।
২. বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত) অনুযায়ী
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী—
কোনো কর্মচারী গুরুতর অসদাচরণ (misconduct) যেমন: চুরি, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধন—এর জন্য বরখাস্ত হলে
পুনঃনিয়োগের আগে অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি নিষ্পত্তি প্রয়োজন
যদি অপরাধ প্রমাণিত থাকে, তাহলে পুনঃনিয়োগ আইনের চেতনার পরিপন্থী।
৩. কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুসারে—
পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors) কোম্পানির fiduciary duty পালন করতে বাধ্য
অর্থাৎ, তাদের সিদ্ধান্ত হতে হবে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে
যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোম্পানির কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে, তাকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া—
দায়িত্বে অবহেলা (negligence)
এমনকি ক্ষমতার অপব্যবহার (abuse of power) হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে
৪. বিচারাধীন মামলার পক্ষকে পুনঃনিয়োগ: আইনি জটিলতা
যখন কোনো ব্যক্তি নিজেই কোম্পানির বিরুদ্ধে রিট মামলা দায়ের করে এবং সেই মামলা চলমান—
তখন তাকে পুনরায় সেই কোম্পানিতে নিয়োগ দেওয়া হলে
এটি conflict of interest সৃষ্টি করে
এতে প্রশ্ন ওঠে—
তিনি কি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন?
নাকি নিজের মামলার স্বার্থে প্রভাব খাটাবেন?
৫. হাইকোর্টের রিট মামলার প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত রিট মামলা চলমান থাকা অবস্থায়—
কোম্পানির উচিত আদালতের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করা
আদালতের রায় বা স্টে অর্ডার উপেক্ষা করে পুনঃনিয়োগ দিলে তা Contempt of Court (আদালত অবমাননা) পর্যন্ত গড়াতে পারে
ন্যাশনাল টি কোম্পানির ক্ষেত্রে যদিও—
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চুরি ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়
সেই বিষয়ে মামলা এখনো বিচারাধীন থাকে
এবং একই সঙ্গে তারা কোম্পানির বিরুদ্ধে রিট মামলার বাদী হয়, সাবেক ম্যানেজার মাহবুবুল আশরাফ ও সাবেক ডিজিএম সামসুল ইসলাম।
তাহলে তাদের পুনঃনিয়োগ দেওয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের পরিপন্থী।
“বিচারাধীন মামলা চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্তদের পুনর্বাসন—এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং সরাসরি আইনের শাসন ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের ওপর আঘাত।