শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
দেশের নদ-নদীর নাব্যতা ধরে রাখা এবং নৌ-যোগাযোগ সচল রাখার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, ড্রেজিং বিভাগের একটি প্রভাবশালী চক্র প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ আত্মসাৎ করছে। এই চক্রের সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের সম্পৃক্ততার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত। বিশেষ করে আরিচা-কাজীরহাট, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, ভৈরব-আশুগঞ্জ এবং মোংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথে খনন কার্যক্রমে নানা অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ড্রেজার সচল না থাকলেও জ্বালানি তেলের বিল তোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া লগবই তৈরি করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেলের হিসাব দেখানো হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি জ্বালানি তেল আত্মসাতের একটি সংগঠিত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে।
এছাড়া খনন করা বালু নির্ধারিত দূরত্বে ফেলার নিয়ম থাকলেও অনেক সময় তা নদীর মধ্যেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে সেই মাটি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসে নৌপথ ভরাট করছে। এতে একই স্থানে বারবার খনন দেখিয়ে বিল তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো:- সরকারি ড্রেজার থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার মাধ্যমে এই ভাড়ার প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই বেসরকারি ড্রেজারের নামে বিল উত্তোলনের ঘটনাও ঘটছে।
ড্রেজার মেরামতের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা দেখানো হলেও বাস্তবে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার বা পুরনো যন্ত্রাংশ সংস্কার করে নতুন হিসেবে দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।
নৌপথ ব্যবহারকারীরা বলছেন, এসব অনিয়মের প্রভাব সরাসরি পড়ছে পরিবহন ব্যবস্থায়। অনেক জায়গায় নাব্যতা সংকটের কারণে লঞ্চ ও কার্গো চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। পদ্মা-যমুনা সংযোগস্থলে প্রায়ই নৌযান আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেজিং কার্যক্রমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চক্র সক্রিয় রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে কিছু অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক তদারকি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ড্রেজিং কার্যক্রম সফল হবে না। এ খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং এবং স্বাধীন নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।