তথ্য অধিকার আইনে একটি প্রকল্পের নথি চাওয়ায় আবেদনকারীর কাছে অস্বাভাবিকভাবে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা দাবি করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। সরকারি নির্ধারিত ফি যেখানে প্রতি দুই পৃষ্ঠার জন্য মাত্র ২ টাকা, সেখানে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করায় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—তথ্যপ্রার্থীদের ভয় দেখানো বা নিরুৎসাহিত করতেই কি এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে?
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মো. তাওসিফ হাওলাদার তথ্য অধিকার আইনে “দেশের ৪৮ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি” শীর্ষক প্রকল্পের টেন্ডার, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণীসহ সংশ্লিষ্ট নথি চেয়ে আবেদন করেন।
এর জবাবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, চাহিত তথ্যের ফটোকপি ও কম্পোজ বাবদ মোট ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। নির্ধারিত কোডে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থ জমা না দিলে তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাজহারুল হক স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ফার্ম নির্বাচন করা হয়েছে ডিপিপিতে বর্ণিত Quality and Cost Based Selection (QCBS) পদ্ধতিতে এবং পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ করে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৩ মে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ২০টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র জমা দেয়। পরে সাত সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড-কে সর্বোচ্চ যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপারিশ করে।
পরবর্তীতে প্রস্তাবটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হয়। অনুমোদন পাওয়ার পর ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর চুক্তি সম্পাদন করা হয় এবং ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়। অধিদপ্তরের দাবি, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৮ জেলায় তিন মাস মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে ৭ হাজার ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তবে তথ্য চাওয়ার পরই বিপুল অর্থ দাবি করার ঘটনায় প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তথ্য অধিকার আইনের স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী তথ্যের ফটোকপি ফি অত্যন্ত সামান্য—সাধারণত প্রতি পৃষ্ঠা কয়েক টাকার বেশি নয়। সেখানে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা দাবি করা বাস্তবে তথ্যপ্রার্থীদের সামনে এক ধরনের প্রশাসনিক দেয়াল তুলে দেওয়ার শামিল।
সুশাসন বিশ্লেষকদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য গোপন রাখতে বা আবেদনকারীদের নিরুৎসাহিত করতে অস্বাভাবিক ফি, জটিল প্রক্রিয়া বা সময়ক্ষেপণের কৌশল নেওয়া হয়। এর ফলে তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্য—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা—প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আবেদনকারী মো. তাওসিফ হাওলাদার বলেন,
“তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়া আমার নাগরিক অধিকার। কিন্তু তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে এমন বিপুল অর্থ দাবি করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এতে মনে হচ্ছে, তথ্য গোপন রাখতেই এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে।”
সুশাসন কর্মীদের মতে, যদি তথ্য চাওয়ার জন্য এভাবে অস্বাভাবিক অর্থের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা কেবল একজন আবেদনকারীকে নয়, বরং ভবিষ্যতে অন্য নাগরিকদেরও তথ্য চাইতে নিরুৎসাহিত করবে। ফলে তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।