শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন
হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্য- গোবরের লাকড়ি
শের ই গুল :
ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, ছবির মতো আঁকা, এঁকেবেঁকে সাপের মতো চলে যাওয়া মেটো পথ, বাড়ির পেছনেই জঙ্গল, পাখপাখালির কলরব, মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা গ্রামকে। যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামে, তারা দেখেছে, সকাল হতেই কৃষক গরু, লাঙল, জোঁয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে চলে যাওয়া, গোয়াল ঘর থেকে গরুগুলো বের করে খড়ের পুঞ্জিতে বেঁধে রাখা। কৃষাণি এসে গরুর গোবর জড়ো করে বাঁশের খাঁচায় নিয়ে যেতেন। একটু অবসর হলে কৃষাণি পাটশোলার চারপাশে গোবর দিয়ে ঢেকে মুঠো দিয়ে চেপে চেপে গোবরের লাকড়ি বানাতেন। তা রোদে শুকাতে দিতে হতো। শুকালে তা দিয়ে রান্না হবে, লাকড়ি হিসেবে।
গোবরের মুঠিয়াও বানান অনেকে। মানে গোবরের মুষ্টি। গ্রামে নিম্ন আয়ের মানুষ গোবর দিয়ে লাকড়ি বানান। অনেকে গাছের পাতা ঝাড় দিয়ে জড়ো করে খাঁচায় ভরে নিয়ে যান, যা রান্নার লাকড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অনেকে গাছের মরা ডাল সংগ্রহ করেন। যা দিয়ে রান্না হবে লাকড়ি হিসেবে। গ্রামে খড় দিয়েও অনেকে রান্না করেন। বনাঞ্চল যদিও বিলুপ্তির পথে। গ্রামে এখন বড় কোনো গাছই চোখে পড়ে না। ইদানীং গ্রামে ইটের ভাটা যত্রতত্র হয়ে গেছে, সব গাছ চলে যাচ্ছে ইটভাটার পেটে। ফলে গাছের ডাল, পাতা দিয়ে লাকড়ি বানানোও হুমকির মুখে পড়েছে। লাকড়ি বানানোর সময় গোবরের সঙ্গে আংশিক ধানের তুষ মেশালে তা শুকানোর পর লাকড়ি হিসেবে জ্বলে বেশি। দুই তিন ফুট লম্বা বাঁশের চিকন লাঠি বা পাটকাঠি কিংবা কাঠখড়ি দিয়ে তৈরে করা হয় গোবরের লাকড়ি। বর্ষার দিন আষাঢ় -শ্রাবণ মাসে একটানা বৃষ্টি হয় পাঁচ-সাত দিন ধরে। গ্রামীণ জীবন হয়ে ওঠে কষ্টের। শুকনা লাকড়ির খুব অভাব দেখা দেয় তখন। গরুর জন্য ঘাস কেটে আনাও সমস্যা দেখা দেয়। দুর্দিনে রান্নার লাকড়ি হিসেবে তখন কাজে আসে গোবর দিয়ে বানানো লাকড়ি। অনেকে গোবর গোয়াইল ঘরের বাঁশ বা শোলায় নির্মিত বেড়ায় গোল করে চেপে লাগিয়ে রাখে। ওখানেই গোবর শুকিয়ে শক্ত হয়ে জমে থাকে। ভালো করে শুকানোর পর গোবার গোয়াইল ঘরের বেড়া থেকে উঠাতে হয়। এটা তখন রান্নার লাকড়ি হিসেবে লাকড়ির নির্দিষ্ট ঘরে রেখে দেওয়া হয়। গোবরের আগুন খুব শক্ত। তাই গ্রামে দেখা যেত গ্রামীণ কবিরাজরা গাছ-গাছালির ওষুধের উপাদান সিদ্ধ দিতেন গোবরের লাকড়ি দিয়ে। অনেকে ধানের খড় গোল করে পেঁচিয়ে তা গোবর দিয়ে মাখিয়ে দিয়ে রোদে শুকাতে দিতেন। অনেকে আবার পাটশোলা, কাঠখড়ি কোনো কিছুই ব্যবহার না করে শুধু গোবর দিয়ে হাতের মুষ্টি বানিয়ে তা রোদে শুকাতে দিতেন। গোবর রোদে ভালো করে শুকিয়ে তারপর রান্নার কাজে ব্যবহার হতো। আধুনিক যুগে নতুন প্রজন্ম গোবরে হাত দিতে নাক সিটকায়। শুকনো গোবরের এই লাকড়ির ব্যাপারে আজকালকার ছেলেমেয়েরা জানে না কিছুই। পাওয়ারটিলারে চাষাবাদ এসে গৃহস্থের এখন গরুর প্রয়োজন হয় না। সারাগ্রাম হেঁটে এলেও হালের গরু পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। গাভীও পালন করেন না আগের মতো। ফলে গোবরের অভাব এখন গ্রামে। সকাল হতেই বা গোসলের আগে কৃষক গোবরের গইডা বা গোবরের লাকড়ি বানাতে আর বসে না। কালের গর্ভে গ্রামীণ সব ঐতিহ্যই হারিয়ে যাচ্ছে। যা কেবল স্মৃতি জাগানিয়া হয়েই ঝুলে থাকবে, ভাবনার বিশদ ডালে।
লেখক: সাহিত্যিক আব্দুল্লাহ আল মামুন (শের ই গুল)