শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
তওবা যদি একনিষ্ঠ হয়, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই
শের ই গুল
হযরত ইউনুস (আ.) যখন তাঁর জাতির ঈমান আনার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন— “হে রব! আমার জাতি কুফরি ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করছে না। আপনি তাদের ওপর আপনার শাস্তি অবতীর্ণ করুন।” আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং ওহী পাঠালেন যে, শীঘ্রই তাদের ওপর আযাব আসবে।
ইউনুস (আ.) তাঁর জাতিকে তিন দিন পর আযাব আসার কথা জানিয়ে দিলেন এবং তিনি নিজে তাঁর ছোট দুই সন্তান ও পরিবার নিয়ে শহর ছেড়ে এক পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। তিনি সেখান থেকে অপেক্ষা করছিলেন কখন নিনেভা শহরের ওপর আযাব নেমে আসে।
আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আ.) জাহান্নামের আগুন থেকে একটি বার্লি (যব) দানার সমপরিমাণ উত্তাপ নিয়ে এলেন এবং তা নিনেভা শহরের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। হঠাৎ আকাশ নিকষ কালো অন্ধকারের মতো হয়ে গেল এবং আযাব মেঘের মতো তাদের মাথার ওপর ঘুরপাক খেতে লাগল। প্রচণ্ড তাপদাহে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ল।
নিনেভাবাসী যখন বুঝতে পারল যে ইউনুস (আ.) সত্য বলেছেন এবং আযাব চলে এসেছে, তখন তারা তাঁকে খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু ইউনুস (আ.)-কে কোথাও পাওয়া গেল না। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করবে। তারা শহরের বাইরে ‘তালআল-রামাদ’ (ছাইয়ের পাহাড়) নামক একটি স্থানে সমবেত হলো।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, তাদের তওবা ছিল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তারা পুরুষ, নারী, শিশু এমনকি তাদের পশুপাখিগুলোকেও সাথে নিয়ে এল।
তারা দুগ্ধপোষ্য শিশুদের মায়েদের থেকে আলাদা করে দিল এবং পশুদের বাছুরগুলোকেও তাদের মায়েদের থেকে আলাদা করে দিল। এতে চারদিকে শিশু ও পশুদের কান্নার এক হৃদয়বিদারক রোল পড়ে গেল।
তারা সবাই নিজেদের মাথায় ছাই মেখে নিল, পায়ের নিচে কাঁটা বিছিয়ে দিল এবং খসখসে পশমের পোশাক পরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মানুষ ও প্রাণীদের এই করুণ আর্তনাদ দেখে ফেরেশতারাও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন— “হে রব! আপনার রহমত তো সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই অবুঝ শিশু আর পশুদের ওপর দয়া করুন।” আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা কবুল করলেন এবং জিবরাঈল (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন আযাব তুলে নিতে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“ইউনুসের জাতি ছাড়া এমন কোনো জনপদ নেই যারা আযাব দেখার পর ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমান তাদের উপকারে এসেছে। তারা যখন ঈমান আনল, আমি তাদের ওপর থেকে দুনিয়ার লাঞ্ছনাদায়ক আযাব তুলে নিলাম।” (সূরা ইউনুস: ৯৮)
হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতির তওবা ছিল ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ। তারা আযাব আসার শেষ মুহূর্তে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে এমনভাবে কাকুতি-মিনতি করেছিল যে, আল্লাহ তাঁর কঠিন আযাবও ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। এটি আমাদের শেখায় , তওবা যদি একনিষ্ঠ হয়, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই।
সূত্র: আত তাউওয়াবীন (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী রহ.)