শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
একসময় শীত মানেই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ভোরবেলা পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত খেজুরের রসের মিষ্টি সুবাস। কুয়াশা ভেদ করে উঠত গরম রসের হাঁড়ির ধোঁয়া। রাস্তাঘাটে মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত জনপ্রিয় স্লোগান খেজুরের রস, খেজুরের গুড়স্মৃতিতে রইল ভরপুর।
কিন্তু ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে সেই ঐতিহ্য। খেজুর গাছ কমেছে, রস সংগ্রহের ব্যবসায়ীরা পেশা বদলে ফেলেছে, আর শীতের সকাল থেকে মুছে যাচ্ছে মিষ্টি ঘ্রাণের সেই স্মৃতি।
গাছ নেই, নেই রসের হাঁড়িতেও টনটন শব্দ
কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায় খেজুর গাছ এখন বিরল। একসময় মেঠোপথের দু’ধারে সারি সারি গাছ ছিল, এখন সেখানে পাকা রাস্তা, দালান, বাণিজ্যিক স্থাপনা।
লংশুরপাড় গ্রামের বাসিন্দা মাসুক মিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন,
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ভোরে রস আনতে যেতাম। এখন গ্রামের রাস্তায় একটাও খেজুর গাছ চোখে পড়ে না। আধুনিকতা সব গিলে খাচ্ছে।
আগে প্রতিদিন সকালে হাঁড়ি হাতে রস কিনতে যেতেন স্থানীয়রা। এখন রস পেতে হলে আগেভাগে অর্ডার দিতে হয়, দামও আকাশছোঁয়া।
‘চার গাছ থেকে দুই হাঁড়ি’ থেকে এখন ‘চার গাছেও এক হাঁড়ি নয়’
কমলগঞ্জের নয়টি ইউনিয়ন ঘুরে জানা যায়, খেজুরের রস সংগ্রহকারী মাত্র একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী এখনও এই পেশায় আছেন। ৩৫ বছরের অভিজ্ঞ মশাইদ আলী বলেন,
আগে রাতেই চারটা গাছ থেকে দুই হাঁড়ি রস উঠত। এখন তিন–চারটা গাছ মিলে এক হাঁড়িও হয় না। গাছ কমে গেছে, রসও কমেছে।
তিনি আরো জানান, এখন এক হাঁড়ি কাঁচা রসের দাম ৬০০–৭০০ টাকা হলেও পাওয়া মুশকিল। পাশাপাশি চুরি–ছিনতাইও বেড়েছে
অনেক সময় রাতে ছেলেপেলে হাঁড়ি নামিয়ে নিয়ে যায়। মানুষও আগের মতো রস কিনতে চায় না। তাই রস দিয়েই গুড় বানাই। খাঁটি গুড় বিক্রি করলে কিছুটা লাভ থাকে।
গাছি নেই, ঐতিহ্যও বিপন্ন কৃষিশ্রমিকের বদলে গাছিরা এখন রাজমিস্ত্রি, গাড়িচালক বা বিদেশগামী শ্রমিক। গাছে উঠে রস তোলার কঠোর পরিশ্রমে তরুণদের আর আগ্রহ নেই।
মাত্র ১০ বছরে ৮০ হাজার থেকে কমে ২ হাজার খেজুর গাছ
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে
দশ বছর আগে জেলায় খেজুর গাছ ছিল প্রায় ৮০ হাজার, বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২ হাজারটি।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন বলেন,
“উন্নয়ন, ভূমির পরিবর্তন ও জলবায়ু প্রভাবের কারণে খেজুর গাছ কমে গেছে। তবে নতুন করে খেজুর গাছ রোপণের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
জলবায়ু পরিবর্তন ও নিপা ভাইরাসের শঙ্কায় মানুষ রস এড়িয়ে চলছে
রসের স্বাদ ও ঘ্রাণ আগের মতো নেই বলেও জানান স্থানীয়রা। গাছ কমার পাশাপাশি রসের পরিমাণও কমে গেছে।
বাজারে খাঁটি গুড়ের সংকট, দামও চড়া
কমলগঞ্জের আদমপুর, ভানুগাছ, মুন্সিবাজার ও শমসেরনগর বাজারে খাঁটি খেজুর গুড় এখন প্রায় অদৃশ্য। বাজারে খাঁটি খেজুর গুড় ৬০০–৭০০ টাকা কেজি
সাধারণ গুড়: ২০০–৩০০ টাকা কেজি
বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় খাঁটি গুড় এখন “সোনার দামে” বিক্রি হয়।
হারানো ঐতিহ্যের স্বপ্ন
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বাড়লে আবারও ফিরতে পারে সেই সুবাসিত সকাল।
একদিন আবার শীতের সকালে বাতাসে ভেসে আসবে খেজুরের রস–গুড়ের মিষ্টি গন্ধ ফিরবে কমলগঞ্জের হারানো ঐতিহ্য