শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১০:২৮ পূর্বাহ্ন
(বৃষ্টি ও বজ্রপাত আতঙ্কে কৃষক-শ্রমিকরা হাওরে নামছেন না। অন্যদিকে হাওর জলাবদ্ধ হওয়ায় কম্বাইন হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না।)
টানা বর্ষণে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করছে। এতে প্রায় ৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।মঙ্গলবার ভোরে উপজেলার উপজেলার বংশিকুণ্ডা ইউনিয়নের হামিদপুর জামের খাল এলাকার এরনবিল ইকরাছই হাওরের স্থানীয় বাঁধটি ভেঙে যায়।
তবে বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মিত কোনও বাঁধ নয় বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।
ওই হাওরে এবার ১১৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছিল। এখনো ৬৪ হেক্টর জমির ধান কাটা বাকি রয়ে গেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারী বর্ষণ হয়েছে। এতে হাওরের ১১০টি ক্লোজার ঝুঁকিতে আছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনা বহাল রয়েছে তাড়াতাড়ি ধান কাটা না গেলে হাওরের ফসল বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ভারী বর্ষণের আশঙ্কায় উজান ও ভাটিতে দ্রুত পাকা ধান কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবারের মধ্যে পাউবো হাওরের ৮০ ভাগ পাকা ধান কেটে ফেলার নির্দেশনা দিলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে গত তিন দিন ধরে হাওরে ধান কাটা থমকে আছে।
বৃষ্টি ও বজ্রপাত আতঙ্কে ভয়ে কৃষক-শ্রমিকরা হাওরে নামছেন না। অন্যদিকে হাওর জলাবদ্ধ হওয়ায় কম্বাইন হারেভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না।
আবার অনেক কৃষক ধান কাটলেও হাওরের ধান পরিবহনের কাঁচা রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় এবং কাদা সৃষ্টি হওয়ায় কাটা ধানও নিয়ে আসতেন পারছেন না তারা। এতে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি বছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হাওরে (হাওর-নন হাওর মিলিয়ে) ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। কাটার গড় হার ৪৪ দশমিক ৫০৯ ভাগ।
বেসরকারি হিসেবে জলাবদ্ধতায় অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার পথে। তবে কৃষি বিভাগের মতে মাত্র প্রায় ৪ হাজার ৫৫৯ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে টানা বর্ষণের কারণে প্রতিটি হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা ধান কাটানোর জন্য শ্রমিক পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধ হাওরের ধান ‘নয়নভাগায়’ কাটছেন হাওরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা।
‘নয়নভাগা’ হলো অর্ধেক ফসল ক্ষেতের মালিকের এবং অর্ধেক শ্রমিকের। এর ফলে কিছু ধান পেলেও কৃষকরা বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন।শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের কৃষক ও উপজেলা কৃষকদলের সিনিয়র আহ্বায়ক আকরামুল হোসেন বলেন, “আমরা এখন নয়নভাগায় ধান কাটাচ্ছি। বিকল্প উপায় নাই। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় ১২০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিকদের দিয়ে ধান কাটানো হচ্ছে।
“এতে শ্রমিকরা লাভবান হলেও কৃষক বিরাট ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কৃষকের জমির খরচই ওঠছে না। তারপরও কৃষকের জমি পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে।”শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু বলেন, “আমাদের সদর ইউনিয়নের ছোট হাওরগুলি জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধান। হাওরের কৃষকরা এবার ফসল তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই কৃষকরা নয়নভাগায় বাধ্য হয়ে ধান কাটাচ্ছেন। ”
হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, “এখনো ৩০ভাগ ভাগ ধান কাটা হয়নি। ৩০ হাজার হেক্টরের মতো জমির ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশাসন বলছে ৫০-৬০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে, জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে অল্প জমির ধান। মাঠের সঙ্গে প্রশাসনের কোনও প্রতিবেদনেরই মিল নেই। এবার হাওরের কৃষক বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন।”
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, টানা বর্ষণে প্রতিটি হাওরের পাকা অবশিষ্ট ফসল ঝুঁকিতে আছে। কৃষকরা চেষ্টা করছেন। ক্ষেতে পানি থাকায় হারভেস্টার যন্ত্র না নামায় ধান কাটা বিলম্বিত হচ্ছে।
তবে এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।