মোবাইল গেমস আর ফার্স্টফুডে আসক্ত
অস্থির এক জেনারেশন তৈরি হচ্ছে দেশে
বিলিভ ইট অর নট, এই জেনারেশনের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই, আদর্শিক কোনো এমবিশান নেই, পবিত্র কোনো মিশন নেই।
এরা রোদে হাঁটতে পছন্দ করে না, বৃষ্টিতে ভিজতে চায় না। কাঁদামাটি, ঘাস, লতাপাতায় এদের এলার্জি। এরা আধা কিলোমিটার গন্তব্যে যেতে আধা ঘন্টা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করে। এরা অস্থির, প্রচণ্ড রকম অস্থির এক জেনারেশন।
এরা গান শোনে না, সিনেমা দেখে না, খেলাধুলাতেও এদের অনীহা। এরা এক্সারসাইজ করে না, সকালে ব্রেকফাস্টও করে না।
এরা সিনিয়রদের সম্মান করে না — না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে যায়, গায়ে ধাক্কা দিয়ে বা পায়ে পাড়া দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসে। সরি বলার টেণ্ডেন্সিও এদের মধ্যে নেই। গুরুজনদের সাথে অনর্থক তর্ক জুড়ে দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার।
এদের মাঝে না পাবেন বিনয়ী ভঙ্গি, না পাবেন কৃতজ্ঞতাবোধ। এদের উদ্ধত আচরণ, ড্যাম কেয়ার অ্যাটিটিউডে আপনি পদে পদে বিব্রত হবেন। সংযত হওয়ার উপদেশ দিতে চাইলেই বিপদ, অপর পক্ষের নাজেহাল হওয়ার সম্ভাবনা একশোতে একশো।
আপনি পাবলিক বাসে চড়ছেন, দেখবেন খালি সিটটায় জায়গা পেতে সবচেয়ে জুনিয়র ছেলেটাই বেশি প্রতিযোগিতা করছে। আপনাকে ধাক্কাটাক্কা দিয়ে সটান বসে পড়বে। তার বয়সের দ্বিগুণ হয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আপনার তেমন কিছু করার থাকে না।
বলছিলাম বর্তমান জেনারেশনের কথা। সবচেয়ে ভয়াবহ কথা, যে আসরে এদের দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই আসরে এরা নিজের জন্য চেয়ার খোঁজ করে। যেখানে চুপ থাকার কথা, সেখানে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করে।
সারা রাত ধরে অনলাইনে থাকে, সারা সকাল ঘুমায়। এরা সূর্যোদয় দেখে না, সূর্যাস্ত দেখে না। সূর্যোদয়ে বিছানায় থাকে, সূর্যাস্তে মোবাইলে থাকে।
এরা মোবাইল গেমস আর ফার্স্টফুডে আসক্ত। নির্দিষ্ট করে বললে মূলত অনলাইন গেম, ফেসবুক, ইউটিউব, রিলস দেখা এদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি।
এরা ইতিহাস জানে না, সাহিত্য বোঝে না, শিল্প সংস্কৃতি কি বস্তু তা চেনে না। এরা বই কেনে না, এরা বই পড়ে না, বই বোঝে না।
এরা নন-স্কিলড। এরা হাঁটতে পারে না, দৌড়াতে পারে না, গাছে চড়তে জানে না, সাঁতার কাটতে পারে না, গান গাইতে পারে না, ছবি আঁকতে পারে না। এদের মধ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার দু:সাহস নেই, পাহাড় কেটে পথ তৈরি করার অদম্য মনোবল নেই। এদের উচ্ছ্বাস নাই, আবেগ নাই, ভালোবাসা নেই। এদের একটাই স্কিল, স্মার্ট ফোন দ্রুত স্ক্রল করতে পারা৷
এদের না আছে মূল্যবোধ, না আছে শ্রদ্ধাবোধ, না আছে শৃঙ্খলা। কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন বলতে হবে, কখন শুনতে হবে, এরা জানে না। এরা কি যে জানে না সেটাও জানে না।
অস্থির এই প্রজন্ম ও তাদের নিরাপত্তা
‘অস্থির…’ এই প্রজন্মের প্রিয় একটি প্রতিক্রিয়া। আসলেই অস্থির। ছুটে চলার নামই এখন জীবন। স্থবির জড় পদার্থের জীবন এখন আর কেউ চায় না, বিশেষত আমাদের এই প্রজন্ম। ছোট বেলায় বাবা মায়ের কাছে কিছু চাইবো? এর আগেই অনেক কিছু ভাবতাম, জড়তা কাজ করতো, চাইবো কি না? বাবা মা দিবেন তো? কেউ কেউ হয়তো একটু এগিয়ে গিয়ে ভাবতাম বাবা মায়ের সামর্থ্য কতটুকুন… থাক, চাইলাম না। আমরা হলাম সাদা কালো টিভি দেখার প্রজন্ম! অনেক ‘ব্যাকডেটেড’। বিটিভি ছাড়া দ্বিতীয় কোন চ্যানেল ছিলো না। লম্বা বাঁশের এন্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই এডজাস্ট করে নিতাম। এর পর এলো অ্যালুমিনিয়ামের ঢাকনা এন্টেনায় লাগিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের নানা লোক কাহিনী নির্ভর ধারাবাহিক দেখে চোখের জল নাকের জল এক করে ফেলার মুহূর্ত।
এখন D2H, wifi, smart phone, apps… কত কি… আমাদের বাসায় একটা টেলিফোন ছিলো, যার ডায়াল ছিলো না। তখন রিসিভার তুললেই এক্সচেঞ্জ অফিসের অপারেটর ফোন রিসিভ করে জানতে চাইতো, কার সাথে কথা বলতে চাই। অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিলো কারো সাথে যোগাযোগ করা। সময় ছিলো স্থবির! ঢাকার বাইরে দৈনিক পত্রিকা আসতো দুপুর গড়িয়ে বিকেল বেলায়, ঢাকা থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে! টিভি চলতো বিকেল ৫ টা থেকে ১১ পর্যন্ত। একটা ধারাবাহিক নাটক দেখে এর পরের পর্ব দেখার জন্য দুই সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতাম। এখন তো ডেইলি সোপ (সাবান নয় কিন্তু…), রিয়্যালিটি শো, টক (ঝাল মিষ্টি) শো, শত শত চ্যানেল আর গুগলের যাদুর ছোঁয়ায় কল্পলোকের চাবিও এখন সবারই হাতে। Facebook, whatsapp, LinkedIn, Viber কতশত স্যোশাল নেটওয়ার্কিং মাধ্যম যে আছে, এর কিছু হয়তো আমরা কোনমতে চালিয়ে নিতে পারছি। আমার চার বছরের মেয়েও বাসায় ঢুকলেই বাবার ফোন নিজের কব্জায় নিয়ে নেয়। দারুণ গেইমস খেলে। কেউ কিন্তু ওকে শিখিয়ে দেয়নি।
গোপাল ভাঁড়, ঠাকু’মার ঝুলি আর দাদু নানীর কোলে শুয়ে গাল গল্প শুনে মন ভরে না এদের বা হয়তো এরা এই সুযোটাই পায় না। Tom & Jerry, Mr. Been, Ben 10, power pop girl আরো কত কি আছে সময় কাটানোর জন্য। আসলে আমরা কি ঠিক পথে ওদের চলতে দিচ্ছি? যান্ত্রিক জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে যৌথ পরিবার এখন যাদুঘরে প্রদর্শনের বিষয় হতে চলেছে। একক পরিবারের নামে আসলে আমরা আমাদের এই প্রজম্মকে একেকটা রোবট বানানোর প্রক্রিয়ায় আছি। এখন চলছে ধুন্ধুমার প্রতিযোগিতা কিভাবে আমার সন্তান কে আরো ভালো রোবট বানাতে পারি। নিজে নিজে বা পাড়ার বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে স্কুলে যাওয়া, টিফিনের ফাঁকে গোল্লাছোট, কানামাছি, বৌচি, চোর-পুলিশ, মোরগ লড়াই আর ভাগাভাগি করে দুপুরের টিফিন খাওয়া এ তো এখন স্মৃতির ভাঁজে ধুলোর আস্তরণে হারিয়ে যাওয়া শৈশব। লম্বা আর বিশাল স্কুলের সবুজে ঘেরা মাঠ, এতো বিলাসিতা এই বাণিজ্যের যুগে। এখন স্কুল নামের কারখানা চালু হয় ফ্ল্যাট বাড়িতে। বাচ্চারা খেলে প্লাস্টিকের খেলনা দিয়ে সাজানো গোছানো ছোট বারান্দায়। সবুজ ঘাসের মাঠ দখল করেছে সবুজ কার্পেট। আমাদের এই শিশুরা বড় অসহায়, বড় অনাদরে বড় হচ্ছে এই অস্থির প্রজন্ম।
মাঝে মাঝে মনে হয় আমারা এই যুগের বাবা মায়েরাও যাচ্ছি একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আমরা আমাদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়নের জন্য বা কারো সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি কিনা বা স্ট্যাটাসের অযুহাতে আমাদের সন্তানদের উপর অন্যায় বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ওদের রোবট বানিয়ে দিচ্ছি নাতো? এখন শিশুরা স্কুলে যায় কিন্তু স্কুল ব্যাগ থাকে বাবা মা বা কারো কারো ড্রাইভারের কাঁধে! কারণটাও যৌক্তিক, এতো ওজনের ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে হেঁটে চলাও অসম্ভব তাদের পক্ষে। বিকেলের খেলাধুলার সময় পাড়ার মাঠে দুরন্তপনা, এ তো কল্পনা! তবে কিছু ভাগ্যবান শিশু যারা ভীষণ প্রাচুর্যে ভাসছে তাদের স্কুল ও বিকেলে ক্লাবের মাঠে প্র্যাকটিস এর সুযোগ আছে ,যা সাধারণত সাধারণ পরিবারের শিশুদের জন্য নয়। তারপরেও দেখুন এই অতি সাধারণ পরিবার থেকেই উঠে আসে মিরাজ, মোস্তাফিজ, মাবিয়া, নাসির বা কলসিন্ধুরের সেই ছোট মেয়েরা যাদের পায়ের যাদুতে আমাদের বয়স ভিত্তিক ফুটবল এখন অন্য উচ্চতায় অথবা কক্সবাজারের জাহিদ… মধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা… হুম আমরা মধু বলে বলে আমাদের কোমলমতি সন্তানদের মুখে বিষ তুলে দিচ্ছি নাতো? ভেবে দেখার এটাই সবচেয়ে সবচেয়ে ভালো সময়…
খুব অবাক হয়ে দেখি ইদানিং এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চলছে। পরকীয়ার বলি হচ্ছে নিজের গর্ভের সন্তান! এটাও সম্ভব? দশ মাস পেটে ধরে যে সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে, তাকে হত্যা করা সম্ভব? হচ্ছে তো? সামিউল, ছোট্ট শিশু, আদাবরে মায়ের ছেলেবন্ধুর (বয়ফ্রেন্ড বলাটাই স্মার্টনেস) হাতে খুন হয়… আবার জুরাইনে বাবার অবৈধ সম্পর্কের জেরে মা তার দুই সন্তান নিয়ে বিষপানে আত্নহত্যা। কার পাপের শাস্তি পাচ্ছে আমাদের এই প্রজন্ম? পরিবারেই নিরাপত্তা পাচ্ছে না ওরা, বাইরের মানুষের কি দোষ? আমরা সবাই জানি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ হচ্ছে মায়ের কোল। না, এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে মাগুরায়। যেখানে মায়ের গর্ভের শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীর আলো দেখেছে তুলতুলে শরীরে বুলেটসহ। হায়রে নিয়তি, আমরা ভুলে গেছি, বাবার কোলে করে রিকশায় চড়া সেই শিশুটির কথা, সন্ত্রাসীদের এলোপাথারি গুলিতে প্রাণ হারানোর পর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে…’
শিশু পূজা প্রতিবেশী মধ্যবয়স্কের লালসার শিকার হয়ে এখনো হাসপাতালের বিছানায়। ওর তো এখন খোলা মাঠে ধুলোবালি গাঁয়ে মেখে ছুটে বেড়ানোর কথা… তৃষা নামের একটা শিশু সম্ভবত গায়বান্ধায় বখাটেদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পুকুরে ঝাপ দিয়েছিলো সম্ভ্রম বাঁচাতে, সেটা সে পেরেছিলো, শুধু জীবনটাই বাঁচাতে পারেনি এই যা.
এই তো সেদিন বুশরা হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় হলো। ২০০০ সালে বুশরাকে নিজের ঘরে একা পেয়ে হত্যা করা হয়। আর হ্যাঁ হত্যা করার আগে তাকে পাশবিক অত্যাচার করতে ভুল করেনি কিন্তু খুনির দল। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট তিন জনকে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও চূড়ান্ত রায়ে তাদের বেকসুর খালাস দেয়া হয়। আইনের হাত অনেক লম্বা। আইন অন্ধ, আবেগ নয়, বরং আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা ও সুগভীর তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিই এখানে বিবেচ্য বিষয়। তাহলে বুশরা কোথায় গেলো? তাকে কি কেউ হত্যা করেছিলো, যদি করে থাকে, তারা কারা? কিসের ভিত্তিতে আগের রায় দেয়া হয়েছিলো? এখন তবে এমন কি হলো যে পাশার দান উল্টে গেলো? আমি বুঝি না, কিচ্ছু বুঝি না…
ইদানিং হয়েছে অদ্ভুত সমস্যা। বলা উচিৎ এটা হয়তো আমার স্ত্রীর মানসিক ব্যাধি। আমাদের দুইটি সন্তান, দুজনই মেয়ে। যক্ষের ধনের মতো ওদের আগলে রাখে, কারো কোলে উঠতে দেয় না। একা বাইরে পাঠানোর তো প্রশ্নই উঠে না। আমি বড় হয়েছি খুব খোলামেলা পরিবেশে। রাজনৈতিক পবিবারের ছেলে তাই নানা পদের মানুষের সাথে আমাদের নিত্য উঠাবসা। এই পরিবারের মেয়ে আমার একঘরে করে মানুষ করা যাবে? এও সম্ভব? কিন্তু যুগ পাল্টে গেছে। আমি বুঝি আমার স্ত্রীর সন্দেহ অমূলক নয়। আমি নিশ্চিত নই আমার মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। আর সরকার বাহাদুর তো সারেন্ডার করেই বলেছে কারো বেডরুম পাহারা দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। কুমিল্লার তনু আর সিলেটের খাদিজা, ওদের দগদগে স্মৃতি এখনো কিছুটা মনে পড়ে, তাই না? আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পদক পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মিতু? চট্টগ্রামে ছোট্ট ছেলের সামনে প্রকাশ্যে রাজপথে খুন হয়েছে। সেও আমরা ভুলতে বসেছি। কারণ উদ্ঘাটন এখনো হয়নি, তবে ইতিমধ্যে পুলিশ স্বামীর চাকরি নাই। দুর্ঘটনাক্রমে তারা সবাই নারী। সমস্যা হলো আমি নিজেও লজ্জায় পড়ে যাই, একজন পুরুষ বলে! জার্মান প্রবাসী বন্ধু রজন শারফী আমাকে প্রায়ই ফোন করে। বিদায় নেয়ার সময় বলে ভাবীরে সালাম দেইস আর আমার মা মনিদের আদর। বন্ধু রজন, তোমার এই আদরটুকু ভার্চুয়ালই থাকুক। দেশে যদি কখনো আসো, আমার মেয়েদের আদর করার সুযোগ পাবে কিনা আমি নিশ্চিত নই…