নেত্রকোণার হাওরবেষ্টিত দুর্গম উপজেলা খালিয়াজুরী। প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশ ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য ধরে রেখেছে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথপুর ময়েজ উদ্দিন সরকার উচ্চ বিদ্যালয় (EIIN: 112981)। প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, পাঠদানের মান ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে।
কিন্তু মেধা ও সাফল্যের বিপরীতে বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত চিত্র অনেকটাই হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিদ্যালয়টি পায়নি একটি আধুনিক নিজস্ব একাডেমিক ভবন। জায়গার সংকট, মাঠের অভাব এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত নানা দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য ইতিপূর্বে প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি অপ্রতুল হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায়নি। এ কারণে আগের সরকারের সময়ে অনুমোদিত একাডেমিক ভবন নির্মাণের টেন্ডার বাতিল হয়ে যায় বলে বিদ্যালয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
ফলে ভালো ফলাফল ও শিক্ষার মানের দিক থেকে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক ভবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
সরেজমিনে বিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বহুতল ভবনের নিচতলার একটি অংশ পানিতে নিমজ্জিত। প্রধান ফটকের সামনে কাদা-পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সরু স্ল্যাবের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
অন্যদিকে পুরনো টিনের ঘরে গাদাগাদি করে চলছে পাঠদান। বর্ষাকালে টিনের চাল চুইয়ে পানি পড়ার অভিযোগও রয়েছে। বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত খোলা ও উঁচু জায়গা। ফলে নিয়মিত প্রাত্যহিক সমাবেশ আয়োজন করাও সম্ভব হয় না।
বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল সন্তোষজনক হলেও অবকাঠামোগত সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি মৌলিক সুবিধা এখনো প্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠেনি।
শিক্ষক মিলনায়তন নেই পাঠদান শেষে শিক্ষকরা বসে প্রশাসনিক কাজ করার জন্য আলাদা কোনো কমন রুমের সুবিধা পাচ্ছেন না।
লাইব্রেরি ও হলরুম নেই শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার জন্য নেই পর্যাপ্ত লাইব্রেরি সুবিধা। একইভাবে পরীক্ষা, সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা অন্যান্য যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও নেই প্রয়োজনীয় হলরুম।
খেলার মাঠের সংকট উঁচু ও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অ্যাসেম্বলি ও খেলাধুলা ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। নির্মাণসামগ্রী রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি এবং অনুমোদিত টেন্ডার বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের পাশেই প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি খাস জমি রয়েছে। সরকার যদি জমিটি বিদ্যালয়ের নামে বন্দোবস্ত দেয়, তাহলে সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি খেলার মাঠ ও প্রাত্যহিক সমাবেশের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ওই জমি বিদ্যালয়ের নামে বন্দোবস্ত করা হলে ভবিষ্যতে একাডেমিক ভবন, লাইব্রেরি, হলরুম, খেলার মাঠ এবং শিক্ষকদের আবাসনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
খালিয়াজুরীর মতো হাওরবেষ্টিত দুর্গম এলাকায় শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে বিদ্যালয়টির অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করায় এলাকাবাসীর মধ্যে বিদ্যালয়টিকে ঘিরে প্রত্যাশাও বেড়েছে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দাবি-বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের জমি ও অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের পাশের প্রায় ৬০ শতাংশ খাস জমি আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া, একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ, লাইব্রেরি ও হলরুম স্থাপন এবং খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে হাওরাঞ্চলের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শুধু ফলাফলে নয়, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একটি মডেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।