বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯ জুলাই এক গভীর বেদনার দিন। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিক্ষক হুমায়ূন আহমেদ। আজ তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের ব্যবধানে এক যুগেরও বেশি পেরিয়ে গেলেও তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে আজও সমানভাবে অনুভূত হয়।
হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি বাংলা ভাষাকে নতুন প্রাণ, নতুন আবেদন এবং নতুন পাঠকসমাজ উপহার দিয়েছেন। তাঁর লেখনী ছিল সহজ, সাবলীল, অথচ গভীর জীবনবোধে সমৃদ্ধ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলতে পারে। জীবনের ক্ষুদ্রতম অনুভূতি, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, রহস্য, মানবিকতা এবং সমাজবাস্তবতার নানা দিক তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। ফলে তাঁর লেখা কেবল পাঠের আনন্দই দেয় না, বরং পাঠককে ভাবায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
তাঁর সৃষ্ট কালজয়ী চরিত্র ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’, ‘শুভ্র’ কিংবা অসংখ্য উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা আজও পাঠকের কাছে জীবন্ত। প্রতিটি চরিত্র যেন আমাদের চারপাশের মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁদের হাসি, কান্না, সংকট ও স্বপ্নের ভেতরেই পাঠক খুঁজে পান নিজের জীবনের প্রতিফলন। এ কারণেই হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য কখনো পুরোনো হয় না বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
সাহিত্যের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর নির্মিত নাটক ও চলচ্চিত্র কোটি দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে। বিনোদনের মধ্য দিয়েও কীভাবে সমাজ, মানবতা ও জীবনের গভীর সত্যকে উপস্থাপন করা যায়, তিনি তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি প্রজন্মকে জ্ঞান দিয়েছেন, তেমনি একজন শিল্পী হিসেবে দিয়েছেন চিন্তার স্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সৌন্দর্যবোধের শিক্ষা।
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে অসাধারণ শিল্পে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা। তিনি কখনো কৃত্রিম ভাষা বা জটিল উপস্থাপনার আশ্রয় নেননি। সহজ-সরল শব্দে গভীর অনুভূতির প্রকাশই ছিল তাঁর লেখনীর প্রধান শক্তি। তাই তাঁর বই পড়ে যেমন একজন কিশোর মুগ্ধ হয়, তেমনি একজন প্রবীণ পাঠকও খুঁজে পান জীবনের গভীর দর্শন। বাংলা সাহিত্যে এমন সর্বজনগ্রাহ্য জনপ্রিয়তা খুব কম লেখকের ভাগ্যেই জুটেছে।
একজন স্রষ্টার প্রকৃত পরিচয় তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত থাকে। শারীরিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর সৃষ্টি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্ম এখনও তাঁর বই সংগ্রহ করে, পড়ে, আলোচনা করে এবং তাঁর চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পায়। এটাই একজন মহান সাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় অর্জন।
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু কেবল একজন লেখকের প্রয়াণ নয় এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর সৃষ্টির অমরত্বই আমাদের সান্ত্বনা দেয়। যতদিন বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা বেঁচে থাকবে, ততদিন হুমায়ূন আহমেদের নাম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান কথাশিল্পীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর বিনম্র শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি অশেষ রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি চিরকাল উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে দীপ্তিমান থাকবেন।