শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১০:২৫ পূর্বাহ্ন
সর্বোপরি, কায়সার কবিরকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত অভিযোগগুলো বাংলাদেশের প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব শুধু তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপনেরও।
তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসন থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নীরবভাবে পরিচালিত হলেও সমাজ ও সাংবাদিক মহলে এটি প্রতিনিয়ত আলোচিত হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, কায়সার কবিরের কার্যক্রমকে অনুসন্ধান ও রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা একমাত্র উপায় জনগণকে তথ্য দেয়ার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার।
প্রতিবেদকরা জানতে পেরেছেন, কায়সার কবির মূলত টেন্ডার ব্যবস্থাপনা এবং ঠিকাদার বাছাইয়ে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে তিনি এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম (পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করেন। যদিও ওটিএম পদ্ধতি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে পরিচিত, তবে বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, কায়সার কবির এই পদ্ধতিকে কৌশলে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যাতে নির্বাচিত কিছু ঠিকাদার ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে টিকে না থাকে। এভাবে তিনি কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন আদায়ের সুযোগ তৈরি করেছেন।
প্রতিবন্ধী সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৬০টিরও বেশি কাজের আইডিতে এই ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিটি কাজের পরিমাণ এবং প্রকল্পের প্রকৃতি অনুযায়ী কমিশনের পরিমাণ কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। ঠিকাদারি মহলের একাধিক ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং তার ফলে কায়সার কবির ব্যক্তিগত সম্পদের ওপরও প্রভাব পড়েছে।
ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ নিজেই একটি “স্বর্ণখনি” হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর সরকারি ভবন, বাসভবন, মেরামত এবং অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ এই বিভাগের আওতায় পড়ে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ হওয়ায় এখানে যে কোনো কর্মকর্তার প্রভাব থাকা মানেই বিপুল ক্ষমতা। অভিযোগ রয়েছে, কায়সার কবির এই বিভাগের পোস্টিং পাওয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের আশ্রয় নিয়েছেন।
কায়সার কবিরের কর্মজীবন শুরু থেকেই বিতর্কের সঙ্গে জড়িত। সাভারে কর্মরত থাকাকালে তিনি ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর ছত্রছায়ায় ছিলেন। পরবর্তীতে জামালপুরে পোস্টিং পাওয়া অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের পারিবারিক ও রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলেন। এসব সংযোগ কায়সার কবিরকে প্রশাসনিক দায়িত্বে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে বড় অংকের ঘুষ দিয়ে কায়সার কবির ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। এমনকি জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র-জনতা হত্যার সঙ্গে তিনি সরাসরি অর্থায়ন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, তবুও রাজনৈতিক মহলে ও প্রশাসনের ভিতরে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।
কায়সার কবির সরাসরি নয়, বরং কিছু বিশ্বস্ত অধস্তন কর্মকর্তার মাধ্যমে পুরো বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেন। বদলি, দায়িত্ব বণ্টন এবং কাজ অনুমোদনের ক্ষেত্রে যারা তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে গিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেউ মুখ খুলতে চায় না, কারণ পোস্টিং, বদলি, বার্ষিক মূল্যায়ন—সবকিছুতেই কায়সার কবিরের প্রভাব প্রতিফলিত হয়।
কায়সার কবিরের জীবনের ধরণ এবং ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে তার জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীতে তার বসবাস, গাড়ি ব্যবহার এবং পারিবারিক ব্যয় বিষয়গুলো আলোচনা সৃষ্টি করেছে। যদিও আনুষ্ঠানিক সম্পদ বিবরণী প্রকাশিত হয়নি, তবে দুদক এবং অন্যান্য সুশাসন সংস্থার কাছে বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার অভিমত, কায়সার কবিরের ক্ষমতা শুধু টেন্ডার বা অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রভাব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া তাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রম বিভাগীয় কর্মচারীদের ওপর ভয়-ভীতি তৈরি করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই ভয়বোধের কারণে কেউ কোনো অভিযোগ করতে সাহস পায় না।
অভিযোগের বিষয়ে কায়সার কবিরের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে যদি তার বক্তব্য পাওয়া যায়, তা সংবাদে সংযুক্ত করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই বিপ্লবের পর প্রশাসনিক সংস্কারের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার সফল বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ এই পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত। কায়সার কবিরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হয়, তবে তা শুধু বিভাগের নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে এখন প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, দুর্নীতির নিরপেক্ষ বিচার এবং প্রশাসনিক সংস্কার। এতে নিশ্চিত করা যাবে যে গণপূর্ত অধিদপ্তর জনগণের জন্য কাজ করবে, কোনো ব্যক্তিগত সিন্ডিকেট বা প্রভাবশালী কর্মকর্তার জন্য নয়। কায়সার কবিরকে ঘিরে যে সব অভিযোগ উঠে এসেছে, তা শুধুমাত্র সংবাদে আলোচিত বিষয় নয়; বরং এটি একটি বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের পরীক্ষার অংশ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, কায়সার কবিরের ক্ষমতার ব্যবস্থাপনা এবং টেন্ডার পদ্ধতির কার্যকরতা নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হলে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া সম্ভব। যদি এই তথ্য যাচাই করা যায়, তাহলে টেন্ডার, ঠিকাদার বাছাই এবং কমিশন বাণিজ্যের বিষয়গুলোতে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে প্রশাসনিক সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবিরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিভাগটির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যেই সামাজিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচিত।