শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর—ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। অথচ সেই দপ্তরকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে, যাদের বিরুদ্ধে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাণিজ্য, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, মোবাইল কোর্টের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় এবং বদলি–পদায়ন ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে—এই কথিত চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক স্টেনোগ্রাফার সুলতান উদ্দিন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আল-আমিন। অভিযোগ রয়েছে,তারা দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের ভেতরে একটি অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলে অবৈধ সুবিধা আদায় করে আসছেন।
লাইসেন্সের নামে ধাপে ধাপে অর্থ আদায়ের অভিযোগঃ ভুক্তভোগী সূত্র জানায়,নতুন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের মোবাইল কোর্টের ভয় দেখিয়ে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হতো। বিনিময়ে দেওয়া হতো অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ‘নিরাপত্তা’। একটি ঘটনায় ‘নিউ বিসমিল্লাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ওসিসি’ নাম ব্যবহার করে লাইসেন্স করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে ৭০ হাজার টাকা এবং পরে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ। তবে প্রতিশ্রুত লাইসেন্সটি আদৌ বৈধ ছিল কি না—সে বিষয়ে এখনো চরম ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। একইভাবে একটি ব্লাড ব্যাংকের মালিকের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী,পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকলেও লাইসেন্স দেওয়া যাবে—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ভুক্তভোগীর দাবি, “টাকা থাকলে কাগজপত্র কোনো বিষয় নয়”—এমন কথাই শোনানো হয়েছিল সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্লিনিক মালিক বলেন,
“ঘুষ না দিলে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিস থেকে কোনো ধরনের লাইসেন্স পাওয়া যায় না—এটাই এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বন্ধ ক্লিনিক ও রহস্যজনক তালিকাঃ সম্প্রতি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জেলায় একাধিক অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করা হলেও, কোন কোন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে—সে সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনাগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে,এর আগেও বন্ধ করে দেওয়া অন্তত ৩৩টি ক্লিনিক পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি,এই পুরো প্রক্রিয়ায় সুলতান উদ্দিন ও আল-আমিন প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। যদিও পরে আল-আমিনকে বদলি করা হয়, তবে সুলতান উদ্দিন এখনো একই দপ্তরে বহাল থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ। বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ,প্রশাসনিক অস্বস্তিঃ শুধু ক্লিনিক বাণিজ্য নয়,বদলি সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য সহকারী মামুনের বদলি ঘিরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মামুন নিজেই জানান,তিনি ও তার ভাই মিলে ওই অর্থ প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ঢাকা) প্রশাসন শাখার পরিচালক ডা. এ বি এম আবু হানিফের স্বাক্ষরিত আদেশে সেই বদলি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জনের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুলতান উদ্দিন দায় এড়ানোর চেষ্টা করে বলেন,তৎকালীন সিভিল সার্জনের নির্দেশেই তিনি সংশ্লিষ্ট আদেশের খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন। তবে অর্থ লেনদেন বা আদেশের বৈধতা প্রসঙ্গে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
ভুক্তভোগীর ক্ষোভঃ স্বাস্থ্য সহকারী মামুন বলেন,
“টাকা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো বদলির আদেশ বাতিল হয়েছে। আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, সামাজিকভাবেও হেয় হয়েছি।”
প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য প্রশাসনঃ একজন সাধারণ স্টেনোগ্রাফারের এমন প্রভাব ও দাপট—যেখানে লাইসেন্স,বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যন্ত তার কথিত নিয়ন্ত্রণে—এ বিষয়টি নিয়ে ময়মনসিংহজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন,তাহলে প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে?
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যঃ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ বলেন,“আমার জানা মতে, এমনটি হওয়ার কথা নয়। তবে মেডিকেল অফিসারের সঙ্গে যোগসাজশ করে কেউ যদি এমন কিছু করে থাকে,তাহলে তা ঘটতে পারে। তাছাড়া আগের সিভিল সার্জন হয়তো এসব সংবাদ পরিবেশনে সহযোগিতা করে থাকতে পারেন।” তার এই মন্তব্য নতুন করে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ তদারকির প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত ও সংস্কারের দাবিঃ সুশাসন ও জনস্বার্থের কথা বিবেচনায় সচেতন মহল অবিলম্বে এই অভিযোগ-গুলোর নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত,অভিযুক্তদের সাময়িক অপসারণ,এবং লাইসেন্স ও বদলি প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ অডিট দাবি করেছেন। জনস্বাস্থ্য যেখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র,সেখানে এমন অভিযোগ শুধু একটি দপ্তরের নয়—বরং পুরো ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।