শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৭:৩১ পূর্বাহ্ন
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকায় কোটিপতি (SDF) এর কিছু কর্মকর্তাবৃন্দ।
পর্ব: ১
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ Social Development Foundation (SDF), ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে Resilience, Entrepreneurship and Livelihood Improvement (RELI) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য— দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবিকা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও টেকসই আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
তবে সম্প্রতি স্থানীয় পর্যায়ে ল্যাপটপ ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে ১৬’কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
RELI প্রকল্পটি দেশের ২০টি দরিদ্র জেলায় ৩,২০০ গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
এর মোট ব্যয় প্রায় ৩৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মূল অর্থায়ন করছে World Bank-এর International Development Association (IDA)।
SDF এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা (Implementing Agency) হিসেবে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী সকল পণ্য ও সেবা ক্রয়ে খোলা টেন্ডার ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাপনা এবং তৃতীয় পক্ষের অডিট বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কিছু গ্রাম সমিতির সদস্যদের দাবি, RELI প্রকল্পের আওতায় ৩,২০০ গ্রামের জন্য ৩২৫০টি ল্যাপটপ সরবরাহের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, “ল্যাপটপগুলো স্থানীয় সমিতি ক্রয় করেনি, বরং সদর দপ্তর থেকে সরবরাহ করা হয়েছে,” এবং কিছু ক্ষেত্রে “ফাঁকা বিল ভাউচার পূরণের নির্দেশ” দেওয়া হয়েছিল এরমধ্যে ASUS ব্রান্ডের, কোর i5 মডেল এর মূল্য- ৯৭১০০ এবং HP ব্রান্ডের, কোর i5 এর মূল্য- ৯৭৪৫০ টাকা ভাউচারে দেখানো হয়েছে কিন্তু ল্যাপটপগুলো পুরাতন মডেলের ও চায়না থেকে রিকন্ডিশন আনা যার প্রকৃত দাম ৪০-৪৫ হাজারের বেশি না, যা প্রায় ১৬’কোটি টাকার অনিয়ম বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
(SDF) এর দুর্নীতির বিষয়ে বাঁকাপুর, নওগাঁ গ্রাম সমিতির সদস্য ও ক্রয়কমিটির আহ্বায়ক বলেন-
“ল্যাপটপ ক্রয় সম্পর্কে আমরা কিছু জানিনা, হেড অফিস থেকে কিনে পাঠিয়ে দিয়েছেন, এবং সঙ্গে ফাঁকা ভাউচার দিয়ে বলেছেন ৯৭৪৫০ টাকা লিখে গ্রাম সমিতির বিল ভাউচার ফাইলে রাখতে”।
পরিচয়গোপন রাখার শর্তে, আর এক গ্রাম সমিতির সদস্য বলেন- “এই মালামাল গুলো নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কেনার কথা ছিল কিন্তু তা না করে হেড অফিসের স্যাররা কিনে দেয়, এটা তো নিয়ম না।”
গ্রাম্য পর্যায়ে এই ল্যাপটপের ক্রয় সংক্রান্ত তথ্যাদি যাচাই-বাছাই করতে যেয়ে কিছু ফাঁকা বিল ভাউচার প্রতিদিনের কাগজের হাতে আসে যা থেকে ল্যাপটপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়।
ভাউচারে (ARK industrial solutions) বা এআরকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিউশন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পায়, ভাউচারে উল্লেখিত ঠিকানায় পৌঁছে এই নামে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি উল্লেখ্য যে ভাউচারে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের দুইটি মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তা বন্ধ দেখায়।
(ARK industrial solutions) এর উল্লেখিত ঠিকানা দোবাদিয়া বাজার, উত্তরখান, ঢাকা স্থানীয় দোকানদার ও এলাকাবাসী মোখলেসুর রহমান(দোকান মালিক) এ বিষয়ে বলেন- আমি এইরকম কোন প্রতিষ্ঠান এই পর্যন্ত শুনি নাই এবং আমি এই জায়গায়(দোবাদিয়া বাজার) মার্কেট হবার পর ২০১৫ সাল থেকে এই ১০ বছর ব্যবসা পরিচালনা করছি। এ বাজারে এত বড় ল্যাপটপের দোকান তো দূরের কথা দুই একটা প্রিন্ট করার কম্পিউটারের দোকান ছাড়া কোন কম্পিউটারের দোকান ই নাই।
এ বিষয়ে প্রতিদিনের কাগজ স্থানীয় মার্কেট মালিক জাহিদ হোসেন কে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান- এগুলো ভুয়া প্রতিষ্ঠান আমাদের বাজারে কম্পিউটারের দোকান তো দূরের ই কথা এখানে দূর দূরান্ত পর্যন্ত কোন দোকানদার ও বলতে পারবে না যে এখানে কোন কম্পিউটার ক্রয় বিক্রয় দোকান ছিল বা ২০-৩০ জন একসাথে কখনো ট্রেনিং দিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান দেখেছে, তারা সম্ভবত অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে এই কাজটি করেছে, এই নামে কোন প্রতিষ্ঠান আমি কখনো শুনি নাই।
অভিযোগের সততা যাচাইয়ে এসডিএফ/SDF এর প্রধান কার্যালয় মোহাম্মদপুরের অফিসে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর নুরুল আমিন কে এ বিষয়ে জানতে চাইলে- প্রথমে অনলাইন মিটিংয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, পরে আনুমানিক দুই ঘন্টা অপেক্ষা করার পর রুম থেকে বেরিয়ে চলে যেতে চেষ্টা করেন, এ সময় তাকে প্রশ্ন করলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোন ধরনের তথ্য দিবেন না ও সরাসরি বক্তব্য দিতে গেলে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেলতে পারেন বলে কিছু জানার থাকলে তার মেইল অ্যাড্রেসে মেইল করার পরামর্শ দিয়ে তাৎক্ষণিক স্থান ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে প্রজেক্ট এর দায়িত্বরত (SDF) কর্মকর্তা মাহবুব আলম (পরিচালক অর্থ) নিকট ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে প্রজেক্টে উঠে আসা অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চেষ্টা করলে তিনি অন ক্যামেরায় কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি তবে অফ ক্যামেরায় জানান, “বাংলাদেশে এ ধরনের বড় প্রজেক্টেগুলোতে কোন দুর্নীতি হবে না এমন কথা কেউ বলতে পারবেনা। সবকিছু বুঝেন ই তো।”
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সাফল্য নির্ভর করে একমাত্র স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতিমালা অনুসরণের ওপর।
SDF-এর মতো প্রতিষ্ঠানের উচিত জনগণের আস্থা বজায় রাখতে প্রতিটি প্রকল্প ব্যয় ও সিদ্ধান্তের হিসাব উন্মুক্ত রাখা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেওয়া।
তাহলেই RELI প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য — গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়ন বাস্তবে রূপ নেবে।