শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন
দীর্ঘদিন ধরে চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকা ময়মনসিংহ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের চিত্র উঠে আসছে। নগরী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক তৎপরতা, কঠোর নজরদারি, মাঠপর্যায়ের অভিযান এবং জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযান, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল কার্যক্রম এবং থানাভিত্তিক সমন্বয় জোরদারের কারণে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন,
“ময়মনসিংহ জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আমরা শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করছি। মাদক, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা সহজ করা হয়েছে, যাতে মানুষ দ্রুত সেবা ও ন্যায়বিচার পেতে পারে। পুলিশের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।” স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ দমনে সমন্বয়হীনতা, শিথিলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির সুযোগে কিছু অপরাধচক্র প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিশেষ করে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে নগরী ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে শুধু অভিযান বা প্রশাসনিক কঠোরতাই নয়—সাধারণ মানুষের কাছে সহজপ্রাপ্যতা ও উন্মুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেও জেলা পুলিশ প্রশাসন ইতিবাচক আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক, ভুক্তভোগী কিংবা সাংবাদিকরা সরাসরি পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন, অভিযোগ জানাতে পারছেন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াও মিলছে।
নগরীর একাধিক ব্যবসায়ী, শিক্ষক, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, আগে বিভিন্ন অভিযোগ বা সমস্যার সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার অভিযোগ ছিল। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় মানুষ নিজেদের সমস্যা ও অভিযোগ সরাসরি উপস্থাপন করতে পারছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা ও আস্থা তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জেলার বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও এখন দৃশ্যমান। দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম বা অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, তাৎক্ষণিক সাড়া প্রদান এবং জনগণের অভিযোগ দ্রুত আমলে নেওয়ার সংস্কৃতি চালুর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে বলে জানা গেছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজসচেতন ব্যক্তিদের মতে, কোনো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারনির্ভর নয়; বরং জনসম্পৃক্ততা, আস্থাভিত্তিক পুলিশিং এবং প্রশাসনের জবাবদিহিমূলক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই জায়গা থেকেই মোহাম্মদ কামরুল হাসানের প্রশাসনিক কর্মকৌশল স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন। এদিকে নগরী ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টহল, সন্দেহভাজন অপরাধীদের ওপর নজরদারি, মাদক ও চাঁদাবাজিবিরোধী অভিযান এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে অপরাধ পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে এসেছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিশেষ করে রাতের বেলায় চলাচল, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আগের তুলনায় স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন তারা।
তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই ইতিবাচক ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা। জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো জেলার পুলিশ প্রশাসন তখনই কার্যকর ও জনবান্ধব হয়ে ওঠে, যখন সাধারণ মানুষ সহজে নিজেদের কথা বলতে পারে এবং অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা অর্জন করে। ময়মনসিংহে সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিবর্তনের চিত্র সামনে আসছে, তা সেই আস্থাভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—বর্তমান ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হয়ে উঠবে।