
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :
ঠাকুরগাঁও জেলার গোবিন্দ নগর এলাকার ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দজিউ মন্দির-এ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে বাসন্তী দুর্গা পূজা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও এ পূজাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মাঝে দেখা গেছে গভীর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আনন্দের সমাহার। একইসঙ্গে শহরের শান্তিনগর ও গড়েয়া এলাকাতেও অনুষ্ঠিত হয়েছে বাসন্তী পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। শনিবার বিকেলে রিভার ভিউ উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী টাঙ্গন নদী ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
শরৎকালের শারদীয় দুর্গোৎসবের জাঁকজমকের বাইরে বসন্তকালীন এই পূজার রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় গুরুত্ব। চৈত্র মাসের শুক্লাপক্ষে পালিত এই বাসন্তী পূজাকেই বাঙালির আদি দুর্গা আরাধনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরাণ মতে, ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের পূর্বে আশ্বিন মাসে অকাল বোধন করার আগে পর্যন্ত বসন্তকালেই দেবী দুর্গার পূজা প্রচলিত ছিল।
২০২৬ সালের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, গত ২৪ মার্চ ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে দেবীর বোধন ও প্রতিমা স্থাপন সম্পন্ন হয়। এরপর ২৫ মার্চ সপ্তমী, ২৬ মার্চ মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজা, ২৭ মার্চ মহানবমী এবং আজ ২৮ মার্চ বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের মতোই দশমীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের আবেগঘন পর্ব।
বাসন্তী পূজার অন্যতম বিশেষ দিক হলো মহানবমী তিথি, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘রাম নবমী’ হিসেবেও পালিত হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই অযোধ্যায় রাজা দশরথের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীরামচন্দ্র। ফলে একদিকে দেবী দুর্গার আরাধনা, অন্যদিকে রামচন্দ্রের জন্মোৎসব—এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাসন্তী পূজা পায় এক অনন্য আধ্যাত্মিক মাত্রা।
শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী দেবীর আগমন ও গমন নির্ধারিত হয় বিভিন্ন বাহনে, যা ভক্তদের মাঝে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, দেবীর আগমন শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটায়।
ঐতিহাসিকভাবে বাসন্তী পূজার সূচনা জড়িয়ে আছে চন্দ্রবংশীয় রাজা রাজা সুরথ-এর নামের সঙ্গে। পুরাণ মতে, রাজ্যচ্যুত হয়ে ঋষি মেধার আশ্রমে আশ্রয় নিয়ে তিনি প্রথম চৈত্র মাসে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন এবং দেবীর কৃপায় পুনরায় রাজ্য ফিরে পান।
একসময় জমিদার বাড়ি ও বনেদি পরিবারের ঐতিহ্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাসন্তী পূজার আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে শারদীয় দুর্গোৎসবের ব্যাপকতার কাছে এই পূজা কিছুটা আড়ালেই রয়ে গেছে।
ভক্তরা জানান, ব্যক্তিগত মনোবাঞ্ছা পূরণের পাশাপাশি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং বিশ্বকল্যাণের প্রার্থনাই এই পূজার মূল উদ্দেশ্য। বসন্তের বিদায়বেলায় দেবী বাসন্তীর এই আরাধনা বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শেকড়কে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় পূজা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে।