শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন
(দেশে ৪০ লাখ বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের ২০ লাখই চলছে ঢাকা শহরে
ব্যাটারির সিসার কারণে বছরে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চলছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। এ দীর্ঘ সময়েও বাহনটি আমদানি কিংবা চলাচলে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেনি সরকার )
শের ই গুলঃ
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চলছে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। এ দীর্ঘ সময়েও বাহনটি আমদানি কিংবা চলাচলে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেনি সরকার। এ সুযোগে দেশের সড়কে বেড়েছে এ জাতীয় যানের সংখ্যা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা মতে, দেশে ৪০ লাখ বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের মধ্যে ঢাকা শহরেই চলছে ২০ লাখ। এসবের বেশির ভাগেরই নিবন্ধন নেই।
বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের (ইজিবাইক ও রিকশা) ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সিসা, সিসা অক্সাইড ও সালফিউরিক অ্যাসিড। এর মধ্যে সিসা সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদান। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিশ্বে সিসা দূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বছরে সিসার কারণে বাংলাদেশে ৩০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সিসা বিষক্রিয়ার প্রভাবে ২৫ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হৃদরোগের কারণে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সিপিডির গবেষণা বলছে, বিশ্বজুড়ে মোট সিসা ব্যবহারের প্রায় ৯০ শতাংশই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এটি পরিবেশ দূষণের একটি বড় উৎস। বাংলাদেশে বিদ্যুচ্চালিত রিকশা ও ইজিবাইক খাতে মোট সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রায় ৭৮ শতাংশ ব্যবহার হয়। ফলে ব্যবহৃত ব্যাটারি অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ উপায়ে পুনর্ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
‘শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার যান সংযুক্তকরণ: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ বিষয়ে গবেষণা করে সিপিডি। গবেষণা টিমের সদস্য ও সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালিদ মাহমুদ দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেহেতু পরিবহন খাতের বাজারের ৭৮ শতাংশই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি দখল করেছে, সেহেতু মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির জন্য দায়ী এ অ্যাসিড। তবে শুধু ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারকে দায়ী করা যাবে না। এর ব্যবহার বিভিন্ন সেক্টরে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘থ্রি-হুইলার নিবন্ধনের জন্য একটি পলিসি বা কাঠামোগত আইন থাকা দরকার। সেটা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানই এর দায় নিতে চাচ্ছে না।’
গবেষণায় আরো জানা গেছে, দেশের পরিবহন খাতে বাজারের মোট ৭৮ শতাংশই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি দখল করেছে, যা উদ্বেগজনক। বিদ্যুচ্চালিত ইজিবাইক খাতেই সিসা-আসিড ব্যাটারির ব্যবহার করা হয় ৭৬ শতাংশ। সৌর গৃহ ব্যবস্থাপনায় ৭ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলের ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয় ৫ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্যাক্সির ব্যাটারিতে সিসা অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় ৪ শতাংশ। টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে ব্যাটারিতে সিসা-অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় ৩ শতাংশ। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ট্রাক, ট্রাক্টর ও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাটারিতে সিসা অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় ২ শতাংশ। বাসের ব্যাটারিতে সিসা অ্যাসিডের ব্যবহার করা হয় ১ শতাংশ।
তবে গবেষকরা বলছেন, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প পরিমাণ সিসাও শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
দেশে বৈদ্যুতিক ও সিসাসমৃদ্ধ যন্ত্রপাতিগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সঠিক নিয়ম নেই বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ছোট-বড় সব ধরনের বিদ্যুৎ কোষ যেখানে-সেখানে ফেলার কারণে সিসা আমাদের খাবার ও পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফসল ও মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকছে। এটি শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বাধা দেয় এবং বড়দের বৃক্ক (কিডনি) ও যকৃৎ (লিভার) বিকল করে দেয়। এছাড়া এটি কর্কট রোগের (ক্যান্সার) মতো মরণব্যাধি তৈরি করে এবং অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে অকালপ্রসব বা বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘যানবাহনের অত্যধিক চাপের কারণে ঢাকা শহরের যানের গতিবেগ অত্যন্ত কমে গেছে। ফলে মানুষের মানসিক চাপ বাড়ছে, যা থেকে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, বহুমূত্র ও অনিদ্রার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’
এসব সমস্যা থেকে বাঁচতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করেন ডা. লেনিন চৌধুরী। তার মতে, বৈদ্যুতিক ও সিসাসমৃদ্ধ যন্ত্রপাতিগুলো যারা মেরামত বা পরিষ্কার করেন, তাদের বিশেষ সুরক্ষামূলক পোশাক পরতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সুরক্ষিত স্থানে কাজ করতে হবে। বর্জ্য অপসারণের জন্য একটি সরকারি নীতিমালা থাকতে হবে, যা মেনে চলা বাধ্যতামূলক। পুরো বিষয়টিকে সঠিক নিয়মের আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে ৪০ লাখ বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে চলছে ২০ লাখ থ্রি-হুইলার। যার মধ্যে কেবল ৫ শতাংশ নিবন্ধিত। আর বাকি ৯৫ শতাংশ নিবন্ধনের বাইরে। চট্টগ্রাম শহরে এ জাতীয় থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৩ লাখ। যেখানে নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে ৭৩ হাজার ৫০০টি, যা ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। থ্রি-হুইলার সংখ্যার তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাজশাহী শহর। এখানে ইজিবাইক চলে ২ লাখ ৯০ হাজার, এর মধ্যে নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে ৯১ দশমিক ২ শতাংশ।
এছাড়া রংপুর বিভাগে থ্রি-হুইলার চলে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০টি, এর মধ্যে রংপুরে শহরে ৪০ হাজার এবং এর ৬ শতাংশের নিবন্ধন রয়েছে। বাকি ৯৪ শতাংশ নিবন্ধনের আওতার বাইরে। খুলনা বিভাগে ২ লাখ ১৭ হাজার ৫০০টি বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার চলে, আর খুলনা শহরে চলে ৩০ হাজার। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৯ শতাংশের নিবন্ধন রয়েছে। বাকি ৯২ দশমিক ১ শতাংশ নিবন্ধনের বাইরে। সিলেট শহরে ৪০ হাজার বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার রয়েছে, যার মধ্যে ১৮ দশমিক ২ শতাংশের নিবন্ধন রয়েছে। বাকি ৮১ দশমিক ৮ শতাংশ থ্রি-হুইলারের নিবন্ধন নেই। ময়মনসিংহ বিভাগে বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার আছে ১ লাখ ৫৬ হাজার, এর মধ্যে শহরে ৪০ হাজার। যার ২৩ শতাংশের নিবন্ধন রয়েছে। বাকি ৭৭ শতাংশই নিবন্ধনের আওতার বাইরে।
বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শহরের প্রধান রাস্তাগুলোতে ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করলে যাতায়াত ব্যবস্থা আরো ঘিঞ্জি ও অনিরাপদ হয়ে পড়ে বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার দৌরাত্ম্যের সমস্যার মূল কারণ হলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদূরদর্শিতা এবং পেশাদারত্বের অভাব রয়েছে। উৎপাদনের শুরু থেকেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত ছিল। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে এ সমস্যা এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন এসব ছোট যানবাহনের নিবন্ধন দিলে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু এর আগে দেখা গেছে, রিকশা বা অন্য যানের ক্ষেত্রে নিবন্ধন দিলেও তাদের সংখ্যা বা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বরং এতে বিশৃঙ্খলা আরো বেড়েছে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়েছে।’
তার মতে, যাতায়াত ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এ খাতে অভিজ্ঞ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া জরুরি। বর্তমানে বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলার খাতটি এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে যারা এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নন। যাতায়াত ব্যবস্থার সুশৃঙ্খল পরিচালনার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ দল থাকতে হবে, যারা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও বড় যানের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করবেন