শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৯:২৬ পূর্বাহ্ন
একসময় কৃষিতে সমৃদ্ধ শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি। কিন্তু বছরের পর বছর নির্বিচারে চাষের জমিতে পুকুর খনন, অবৈধ ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে বর্তমানে সেই কৃষিজমি কমে নেমে এসেছে মাত্র ১৮.৪৪৯ হাজার হেক্টরে। এতে বিপাকে পড়েছেন কয়েক হাজার কৃষক, হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। একদিকে অনাবৃষ্টি, পানি সংকট, অন্যদিকে বর্ষার পর জলাবদ্ধতার কারণে ভেদরগঞ্জে কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। যেখানে তিন ফসলি জমি ও উর্বর ধানের জমি কেটে অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক পুকুর খনন করা হচ্ছে। এসব পুকুরের কারণে আশ-পাশের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে ধান, পাট ও সবজি চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষি অফিস, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, জেলায় সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার উপজেলা ভেদরগঞ্জ। দুটি থানা নিয়ে গঠিত উপজেলায় ছিল প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি। কিন্তু বছরের পর বছর নির্বিচারে চাষের জমিতে পুকুর খনন, অবৈধ মাটি ভরাট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে বর্তমানে সেই কৃষিজমি কমে নেমে এসেছে মাত্র ১৮.৪৪৯ হাজার হেক্টরে। এতে বিপাকে পড়েছেন কয়েক হাজার কৃষক, হুমকির মুখে পড়েছে উপজেলার কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। উপজেলার মহিষার ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডে পাঠান বাড়ী বিল এলাকায় ১০ টি স্পষ্টে ৩০ একর বিল জুড়ে কৃষি জমিতে একমাস ধরে অনুমতি ছাড়াই পুকুর খনন করা হচ্ছে। একই এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সিকদারের বাড়ীর পিছনে দুই একর কৃষি জমিতে শ্রেণি পরিবর্তন না করে অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর খনন করার কারণে বন্ধ রয়েছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। একারণে ওই এলাকার কয়েকশত কৃষক কৃষি কাজ করতে পারছেন না। চরসেনসাস ইউনিয়নের বেরাচাক্কি এলাকায় ১০ একর কৃষি জমির পাশাপাশি সরকারের খাস জমি দখল করে তিনটি মাছের ঘের করা হচ্ছে। সেখানে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি কাজ। ছয়গাঁও ইউনিয়নের আনন্দ বাজার, ভেনপা, চাটার বাজার, পাপড়াইল সহ কয়েকটি জায়গায় প্রায় ৫০ একর কৃষি জমিতে চলছে পুকুর খননের কাজ। উপজেলায় গত দশ বছরে প্রায় বিশ হাজার হেক্টর আবাদি জমি বিভিন্ন কারণে কমে এসেছে। একসময় এই উপজেলার কৃষি পন্য স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হতো। এখন উপজেলা জুড়ে অপরিকল্পিত পুকুর খনন হওয়াতে কাঙ্খিত ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। এতে দিন দিন এই অঞ্চলের অনেক কৃষক বেকার হয়ে পড়ছে। যে কারণে কৃষকরা দিনদিন তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিয়ে দেশের বাইরে কর্মের জন্য চলে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম।এদিকে দ্রুত অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ, নষ্ট হওয়া কৃষিজমি পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন শরীয়তপুর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি প্রতিবছরই দেখি কৃষি জমিতে শ্রেণি পরিবর্তন না করে মাছের ঘের করা হচ্ছে। প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে তবে এখনও আমাদের অঞ্চলে পুকুর খনন বন্ধ করা যাচ্ছে না। সামান্য জরিমানা স্থায়ী সমাধান নয়। একদিকে প্রশাসন জরিমানা করছে অন্যদিকে রাতের আঁধারে ঘেরগুলো তৈরি করে ফেলছে চক্রটি। তাই আমি মনে করি মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি নজরদারি বাড়াতে হবে। তাহলে হয়তো কৃষক ফসল উৎপাদন করতে পারবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভেদরগঞ্জে ভবিষ্যতে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
মহিষার ইউনিয়ন উত্তর মহিষার এলাকার বাসিন্দা কৃষক রহিম মিয়া বলেন, আমার ২০ শতাংশ জমিতে আমি কৃষি ফসল উৎপাদন করতাম। এখানে ইরি ধান, পাট, গম, মরিচ সহ বিভিন্ন কৃষি ফসল হতো। এবছর কিছুই করতে পারি নি। কারণ মাছের ঘের তৈরি করা মালিকগণ ব্লকের পানি আটকে রেখে পাশের জমিগুলো পুকুর খনন করায় আমার জমিতে সেচের পানি আসে না। তাই এবার এখানে ইরি ধান করতে পারি নি। পুরো জমিটা ফেলে রাখতে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আমার জমিটুকু মাছের ঘের তৈরি করতে দিয়ে তাদের দলে যোগ দেই। তাছাড়া আমি একা তো আটকে রাখতে পারব না। তারা কাউকে কিছু না বলেই রাতের আঁধারে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে ফেলে। কৃষকদের এক প্রকার জিম্মি করে এই কাজগুলো করছেন স্থানীয় জয়নাল ও খোকন সিকদার। কেউ জমি দিতে না চাইলে তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ধামকি প্রদান করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয় না। আমরা সাধারণ কৃষক কোথায় গিয়ে কৃষি জমি রক্ষা করবো বলেন।বেরাচাক্কি এলাকার আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, একজন নিজের লাভের আসায় পুকুর কাটছে কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে আমাদের সবার। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখছি না। আগে এই জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবার ধান হতো। আমি জমি দিতে চাই নি। তারা জোরপূর্বক আমার জমির মালিকের কাছ থেকে জমি নিয়ে নিছে। বেশি টাকার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় ঘের মালিক মমিন দিদার আমার জমির মালিকের কাছ থেকে জমি নিয়ে নিছেন।
অভিযোগের বিষয় ভেকু মালি খোকন সিকদার বলেন, জোরপূর্বক নয় ইচ্ছাকৃত ভাবে কৃষক জমি গুলো আমাদের দিয়েছে তাই কাটছি। শ্রেণি পরিবর্তন অথবা অনুমতি নিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনুমতি চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে তবে এখনো অনুমতি পাই নি। প্রশাসন আমাকে মৌখিক অনুমতি দিয়েছে তাই কাটছি আপনি উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। তবে অপর অভিযুক্ত জয়নাল ও মমিন দিদার বক্তব্য দিতে রাজি হয় নি।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার কৃষিবিদ তানবীন হাসান শুভ বলেন, আমাদের দপ্তরের তথ্যানুযায়ী একসময় উপজেলায় প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি ছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এই হারে কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বড় সংকটে পড়বে। অনুমোদন ছাড়া পুকুর খনন সম্পূর্ণ বেআইনি।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক বলেন, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন অনুযায়ী তিন ফসলি জমিতে পুকুর খননের কোনো সুযোগ নেই। অবৈধভাবে যারা পুকুর খনন করছে, তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চলমান রয়েছে।