শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন
ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অভিযোগের পর ভুক্তভোগীর বাড়িতে হামলা, লুটপাট, প্রকাশ্য মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনা ঘটলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া তো দূরের কথা—উল্টো অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেই পুলিশ কর্মীকেই, যাঁর বিরুদ্ধেই ঘুষ গ্রহণ ও দায়িত্বে অবহেলার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানাধীন ভাটি ঘাগড়া এলাকায় বসবাসকারী শিউলী আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন। অভিযোগপত্রের স্মারক নং–১০৬৭/আর–০৯/১২/২৫ ইং।
ধর্ষণের অভিযোগ ও আদালতে মামলা
ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, একই এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুল ফকির (৩৫) দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। গত ১১ আগস্ট ২০২৫ দুপুরে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি জোরপূর্বক ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে ধর্ষণ করে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ঘটনায় শিউলী আক্তার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল,ময়মনসিংহে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং–২১৬/২০২৫)। মামলা তুলে নিতে চাপ ও ধারাবাহিক হামলাঃমামলা দায়েরের পর থেকেই অভিযুক্ত ও তাঁর সহযোগীরা মামলা তুলে নিতে ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপ দিতে থাকে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর ২০২৫ দুপুরে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর বাড়িতে ঢুকে শাশুড়িকে হুমকি দেয়। আপোষে রাজি না হওয়ায় নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট করে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
প্রকাশ্য মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি
এরপর ২৪ অক্টোবর ২০২৫ সকালে ‘দরবার–শালিশ’-এর কথা বলে ডেকে নিয়ে ভুক্তভোগী ও তাঁর স্বামীকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতেই অভিযুক্তরা হুমকি দেয়—থানায় গেলে লাশ গুম করে ফেলা হবে। পুলিশি অবহেলার গুরুতর অভিযোগঃ ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোতোয়ালি মডেল থানার বিট কর্মকর্তা এসআই খালিদ ও এএসআই আব্দুল আলী অভিযোগ গ্রহণ ও সুষ্ঠু তদন্ত না করে অভিযুক্ত পক্ষের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। এর ফলে থানায় পৃথকভাবে মামলা রুজু হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই বিস্ময়করভাবে অভিযুক্ত এসআই খালিদকেই পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পুলিশের বক্তব্য: তদন্ত পরিবর্তনের আশ্বাস
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত অপারেশন) জানান,
“আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি নাজমুস সাকিব স্যার এখানে নতুন। তাই হয়তো এসআই খালিদ যে অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেটি তিনি অবগত ছিলেন না। তবে যেহেতু অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, সেহেতু আমরা অন্য কোনো সাব-ইন্সপেক্টর দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করবো এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নিঃ এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান অভিযুক্তসহ অন্যান্য অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। জীবন ঝুঁকিতে ভুক্তভোগী পরিবার
শিউলী আক্তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী হওয়ায় যে কোনো সময় তাঁকে, তাঁর স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের হত্যা বা গুম করে ফেলতে পারে। বর্তমানে পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
প্রশাসনের কাছে ভুক্তভোগীর দাবি
জেলা পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী নিম্নোক্ত দাবিগুলো জানিয়েছেন—ধর্ষণ,হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় পৃথক ও সুষ্ঠু মামলা রুজু। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা। ভুক্তভোগী পরিবারটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা,ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—এই প্রশ্ন এখন জনমনে। পুলিশের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তদন্ত পরিবর্তনের আশ্বাস মিললেও বাস্তব প্রয়োগ ও কার্যকর পদক্ষেপই এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপের জোরালো দাবি হয়ে উঠেছে।