শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া ইউনিয়নে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যা বলে দাবি করলেও মামলা গ্রহণ না করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে খিদিরপাড়া ইউনিয়নের ধাইরপাড়া গ্রামে স্বামী আনোয়ারের বাড়ি থেকে মোসা. জান্নাত (২১) নামের ওই গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। জান্নাত লৌহজং উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার সংসারে সাত মাস বয়সী এক কন্যাসন্তান রয়েছে, নাম আয়েশা।
নিহতের বাবা-মা জানান, প্রায় দুই বছর আগে জান্নাতের সঙ্গে আনোয়ারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই জান্নাতের দাম্পত্য জীবন ছিল অশান্ত। শ্বশুর-শাশুড়ি, দুই ননদ, এক জা ও ননদের স্বামীসহ একই বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে জান্নাতের বিরুদ্ধে।
নিহতের স্বজনদের দাবি, আনোয়ারের এটি দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে আনোয়ারের পরকীয়ার বিষয় জানতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে চলে যান। এই তথ্য গোপন রেখেই জান্নাতকে বিয়ে করেন আনোয়ার। পরবর্তীতে জান্নাত বিষয়টি জানতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বামী বিদেশে অবস্থান করলেও বড় ভাবির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং তার নামে একটি অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠাতেন। এসব বিষয়ে জান্নাত প্রতিবাদ করলে তাকে নির্যাতন করা হতো।
পরিবারের অভিযোগ, গর্ভবতী অবস্থাতেও জান্নাত নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তার হাতে গরম চাটার ছ্যাঁকা দেওয়া হয়, যা ননদ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে গ্রামে একবার সালিশও হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার দিন জান্নাতকে মৃত অবস্থায় অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, শ্বশুর-শাশুড়ি অটোরিকশায় মরদেহ বহনের সময় জান্নাতের বুকের ওপর পা রেখে হাসপাতালে নিয়ে যান, যা অমানবিক ও সন্দেহজনক বলে তারা দাবি করেন।
ঘটনার পর সাংবাদিকরা শ্বশুরবাড়িতে যোগাযোগ করলে ননদের ছেলে ফোন ধরে জানান, বাড়িতে কেউ নেই। পরে প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দেন এবং হুমকিমূলক ভাষায় কথা বলেন বলে অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে জান্নাতের মরদেহ ঘরের ভেতরে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ঝুলতে দেখা যায়। তবে আত্মহত্যার ঘটনায় সাধারণত পুলিশ এসে মরদেহ নামানোর নিয়ম থাকলেও, এ ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ির লোকজনই মরদেহ নামান। এতে ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। স্থানীয়দের দাবি, গলায় ফাঁস দিলে দাগ থাকার কথা থাকলেও জান্নাতের গলায় কোনো স্পষ্ট দাগ ছিল না। তার চুল এলোমেলো ছিল, যা দেখে অনেকের ধারণা—তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন।
নিহতের বাবা ও স্বজনরা লৌহজং থানায় গিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করতে চাইলে ওসি মামলা গ্রহণ করেননি বলে অভিযোগ করেন। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে—কেন পুলিশ মামলা নিতে অনাগ্রহী।
এ বিষয়ে লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তারা একটি অভিযোগ গ্রহণ করেছেন। তবে একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করায় বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে তিনি উল্লেখ করেন। থানার এক তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, বাদী উপস্থিত না থাকলে মামলা নেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, নিহতের গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, তারা নিজেরাই নিহতের বাবাকে সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। তবে সে সময় ওসি উপস্থিত ছিলেন না। তদন্ত কর্মকর্তা তাদের জানান, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়া মামলা রেকর্ড করা যাবে না।
ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা।