শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন
পোশাক বদলায় শাসন বদলায় পুলিশের বঞ্চনা বদলায় না
মাসুম কাজী :
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিসিএস ১৫, ১৬, ১৮ ও ২০তম ব্যাচের অন্তত ১০১ জন বঞ্চিত কর্মকর্তার অধিকাংশেরই এখনো মূল্যায়ন হয়নি। ফলে পুলিশের ভেতরে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার দলদাস হতে না পারায় তাদের কপালে দুঃখ নেমে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ১৫, ১৬ ও ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের বঞ্চিত রেখে ২০২২ সালে ২০তম ব্যাচের ১৬ জন কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেয়।
আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ছাত্রলীগ ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া পুলিশের কোনো কর্মকর্তার ভাগ্যে পদোন্নতি জোটেনি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পদোন্নতি তো দূরের কথা, অনেক কর্মকর্তাকে মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগে বছরের পর বছর চাকরির বাইরে রাখা হয়েছে, ওএসডি করে রাখা হয়েছে কিংবা শাস্তিপ্রাপ্তদের পোস্টিং দেওয়া হয়—এমন স্টেশনে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে বহু কর্মকর্তা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কেউ কেউ সম্মান রক্ষায় বিদেশি মিশনে যাওয়ার অপেক্ষায় থেকেছেন। এমনকি ওই তালিকার কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করেছেন।
সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায় আদেশ না মানায় দুই দফা চাকরি হারান। একবার আদালতের নির্দেশে এবং আরেকবার সরকারের নির্বাহী আদেশে চাকরি ফিরে পেলেও বঞ্চনা পিছু ছাড়েনি। পোশাক বদলায় শাসন বদলায় আর পুলিশের বঞ্চনা কিছু অসৎ পুলিশের জন্য ভিতরের মানুষটির পরিবর্তন হয় না।
আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, দুঃশাসন, গুম-খুন ও নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় তিনি ২০২২ সালে এসপি পদ থেকেই দ্বিতীয় দফায় চাকরি হারান।
বিসিএস ১৫ তম ব্যাচের কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের ব্যাচমেটরা অনেক আগেই অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেলেও তিনি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এসপি থেকে সরাসরি ডিআইজি হন। তবে দুবার দেওয়া পদোন্নতির তালিকায় তার নাম ওঠেনি। শুধু ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান নন—তার মতো বঞ্চিত মেধাবী কর্মকর্তা ড. আশরাফুর রহমান, ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূইয়া এবং ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা নজমুল হোসেন দিদারসহ অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তা এখনো বঞ্চিতই রয়ে গেছেন।
রাজনৈতিক তকমায় দমিয়ে রাখার অভিযোগ:
পুলিশের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে কীভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে—তারও বিবরণ পাওয়া গেছে। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ড. আশরাফুর রহমান ও ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা নজমুল হোসেন দিদারকে প্রায় ১৫ বছর ধরে টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে একই জায়গায় আটকে রাখা হয়। চাকরির অধিকাংশ সময় তাদের টুরিস্ট পুলিশেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।
শুধু তাই নয়, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খানকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অন্যদিকে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ডিএমপির আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) ফারুক আহমেদকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে বদলি করা হয়, যা বিশ্লেষকদের মতে ‘ডাম্পিং পোস্টিং’ বা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
পদায়ন হলেও গুরুত্বহীন দায়িত্ব:
বিগত আমলে দীর্ঘ ১৮ বছর বঞ্চনার শিকার ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাকে হাইওয়ে পুলিশে পাঠানো হয়েছে। একইভাবে কেএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ডিআইজি আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহকে সারদা পুলিশ একাডেমিতে, ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ডিআইজি মোহাম্মদ উসমান গনিকে টুরিস্ট পুলিশে এবং এসবির অতিরিক্ত ডিআইজি এ.কে.এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজীকে এসবিতেই অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
মেধাবীদের দীর্ঘ বঞ্চনা:
২০তম ব্যাচের প্রথম স্থান অধিকারী আশিক সাঈদ বিএনপি-জামায়াত আমলে রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রের গায়ে ‘জামায়াত-শিবির’ তকমা লাগিয়ে তাকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত রাখা হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে এডিশনাল ডিআইজি হিসেবে সংযুক্ত আছেন।
একই ব্যাচের আরেক মেধাবী কর্মকর্তা আবদুল মাবুদ (দুলাল) শেখ হাসিনার শাসনামলে সাড়ে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত ছিলেন। ২০০৪ সালে কুমিল্লায় বিএনপির এক সম্মেলনে তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রটোকল দেওয়ার সময় তোলা একটি ছবিকে কেন্দ্র করে তাকে বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। সরকার পতনের পর তাকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে বর্তমানে ডিআইজি হিসেবে হাইওয়ে পুলিশে পদায়ন করা হয়েছে।
পদ ফাঁকা, তবু পদোন্নতি নেই:
সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদ আমলে যেমন বঞ্চনার সারি দীর্ঘ ছিল, বর্তমান সময়েও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদে বিষয়টি বেশি চোখে পড়ছে। চলতি বছরের ২৯ মে ডিআইজি পদে ২৯টি শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতির জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বঞ্চিতদের ক্ষোভ ও আশঙ্কা:
বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলছেন, জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ফ্যাসিবাদ আমলে তাদের পদোন্নতি হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর ভাগ্যের পরিবর্তন হবে ভেবেছিলেন। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি নেই। প্রতি সপ্তাহে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা হলেও পুলিশের পদোন্নতির বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে আলোচনায় আসছে না। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।
এক বঞ্চিত কর্মকর্তা বলেন, “সহসাই পদোন্নতিজট না খুললে বিষয়টি আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।” তার অভিযোগ, বর্তমান সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা পড়লেও ফাইল চাপা পড়ে আছে।
অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদ শূন্য থাকার পরও কেন পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না—এ বিষয়ে জানতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং আইজিপির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।