শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
রাজধানী জুড়ে হিজড়াদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনজীবন
মাছুম কাজী :
গত বুধবার মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল পথে চলাচলকারী একটি বাসে উঠে পড়ে দু’জন হিজড়া। প্রত্যেক যাত্রীর কাছে গিয়ে টাকা চাইতে থাকে। কেউ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেই গায়ে হাত দিচ্ছিল, আজেবাজে কথা বলছিল। তারা বাস থেকে নেমে যেতেই একাধিক যাত্রী বললেন, হিজড়াদের টাকা আদায় এখন রীতিমতো উৎপাতে পরিণত হয়েছে। হিজড়াদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
এদিক থেকে ঢাকা তাদের সবচেয়ে পছন্দ। সদ্য জন্ম নেয়া কোনো শিশুর খবর পেলেই বাসাবাড়িতে চলে আসছে হিজড়ারা। তাদের দাবির পরিমাণ অর্থ না দিলে বিশৃঙ্খলা শুরু করে। উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন ঘটনার খবর জানা যায়। এমনই একজন ভুক্তভোগী বাড্ডার বাসিন্দা তাহ্নিয়া সুলতানা বলেন, ‘বাচ্চার বয়স ২০ দিন না হতেই একদল হিজড়া এসে হাজির। হট্টগোল শুরু করে। ১০ হাজার টাকা না দিলে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করার হুমকি দেয়। পরে তিন হাজার টাকা দিয়ে রেহাই মেলে।’
কয়েক দিন আগে হিজড়াদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তি বলেন, ‘অফিসের নারী সহকর্মীর সঙ্গে কাজে যাচ্ছিলাম। সায়েন্স ল্যাব পুলিশ বক্স মোড়ে রিকশার জট লাগতেই দুই হিজড়া দু’পাশে এসে দাঁড়িয়ে টাকা চাইল। নারী সহকর্মীর শরীরে হাত দিতে শুরু করলে ২০ টাকা দেই। কিন্তু তারা আজেবাজে কথা বলতে শুরু করে।
তবে হিজড়ারা বলছে, তারা নিরুপায়, টাকা না তুললে তারা খাবে কি। তাদের আয়-রোজগারের কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছে। ইদানীং কিছু নকল হিজড়ার কথাও বলছে অনেকে, যারা মূলত পুরুষ কিন্তু হিজড়া সেজে টাকা আদায় করছে।
এদিকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে হিজড়াদের নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর হয়নি। সোস্যাল সেফটি নেটের এক বৈঠকে ২০১৬ সাল থেকে তাদের ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচয় নির্ধারণসহ তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে হিজড়াদের নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলা হয়, সরকার আরো বিশ্লেষণের পর নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। বৈঠকে হিজড়াদের উন্নয়নে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার বিষয়ে একমত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তবে সেই সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্তরূপ পায়নি বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সর্বত্র রয়েছে এদের নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন বাস কাউন্টারে তারা টাকা তুলছে। ঢাকার বনশ্রী, খিলগাঁও, মতিঝিল, উত্তরা, মোহাম্মপুর, আদাবর, গুলশান, বনানী, মহাখালী, ফকিরাপুল, আরামবাগ, লালবাগ, শান্তিনগর, মধুবাগ, মিরপুর, মধ্যবাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে হিজড়াদের চাঁদাবাজি চলছে।
একাধিক হিজড়া জানান, তারা নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলেন। যেসব ভাষায় কথা বলা হয় তার মধ্যে কয়েকটি হলো Ñ চাম দেখ (গাড়ির ভেতরে ভালোভাবে দেখ, কি-কি আছে)। পান্তির কাছে কি থাপ্পু (টাকাসহ আর কি-কি আছে)? উত্তরে তারা বলে, আক্কা থাপ্পা (অনেক টাকা)। তখন জিজ্ঞেস করা হয়- কুনকুন (মোবাইল ফোন) আছে কিনা? ঝান্নিমাসি (সোনার চেইন), গিয়ানি মাসি (ল্যাপটপ) আছে কিনা?
জানা গেছে, টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই শতাধিক হিজড়া বসবাস করছে। তাদের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। তুরাগ, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান খিলক্ষেত থানা এলাকায় আছে অন্তত ২০টি গ্রুপ। দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ, কাঁঠালতলা, কোর্টবাড়ী, আজমপুর কাঁচাবাজার, কসাইবাড়ী, আশকোনা এলাকায় আছে ৪০টি গ্রুপ। একেকটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। গ্রুপগুলোর মধ্যে রাহেলা, স্বপ্না, কল্পনা হিজড়ার কয়েকটি বাড়ি রয়েছে। রাহেলা হিজড়া থাকেন দক্ষিণখান। তার একটি পাঁচ তলা বাড়ি আছে। ওই বাড়িতে হিজড়ারা বসবাস করে।
তুরাগের কামারপাড়া, রাজাবাড়ী, ধউর, রানাভোলা, বাউনিয়া এলাকায় থাকে ১০টি গ্রুপ। তাদের গ্রুপ প্রধান হচ্ছেন কচি হিজড়া। সবাই তাকে গুরু মা বলে ডাকেন। তিনি কোটিপতি বনে গেছেন। তার আছে দুটি বাড়ি। মোহাম্মদপুর ও আদাবরে আছে ১২টি হিজড়া গ্রুপ। একটি গ্রুপের প্রধান হচ্ছেন সুইটি। আদাবরে তার নামে আছে একটি বাড়ি।
খিলক্ষেত এলাকায় হিজড়াদের দলনেতা নাজমা হিজড়ার অধীনে রয়েছে ৪০ জন হিজড়া। ৩০ বছর আগে পুরুষাঙ্গ কেটে হিজড়া হয়েছে নাজমা। সে এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে বেশ পরিচিত। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা বিভিন্ন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের কাছে তার সুদে দেয়া আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে তার মাসিক আয় প্রায় দুই লাখ টাকা। ফায়দাবাদ, খিলক্ষেত ও গাজীপুর বোর্ড বাজার এলাকায় তার ৩টি বাড়ি ছাড়াও একাধিক প্লট রয়েছে। বটতলা ক ১৮৩/৫নং মায়ের দোয়া নাজমা ভিলায় থাকেন নাজমা হিজড়া। এটি তার নিজের বাড়ি। খিলক্ষেত নামার বউরা এলাকায় আছে দুটি প্লট। ধলপুর এলাকার আবুল হিজড়ার দুটি বাড়ি আছে। গোলাপবাগ এলাকার ১৩/বি/১ নম্বর পাঁচ তলা ও ধলপুর লিচুবাগানে একটি চার তলা ভবনের মালিক তিনি।