ঘর ছিল তালাবদ্ধ, নীরব ছিল চারপাশ—ভেতরে পড়ে ছিল এক শ্রমজীবী মানুষের নিথর দেহ
ঢাকার আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে মোঃ কামরুল খান (৪৪) নামে এক রাজমিস্ত্রির গলা কাটা মরদেহ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা জেলা। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত মোঃ আল-আমিন (৩৬)কে খুলনার তেরখাদা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার আল-আমিনের দেওয়া তথ্য জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি এবং নিহত কামরুল খানের মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে পিবিআইয়ের দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ আগস্ট আশুলিয়া থানাধীন বাসাইদ এলাকার আমির আলীর ভাড়া দেওয়া টিনের চালার একটি কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা বিষয়টি পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পিবিআই ঢাকা জেলার ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করে।
নিহত কামরুল খান খুলনার তেরখাদা থানার কালাপাটগাতি গ্রামের মৃত করিম খানের ছেলে। এ ঘটনায় নিহতের মামাতো ভাই মোঃ জামিল শেখ বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে পিবিআই স্ব-উদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোঃ মোস্তফা কামালের দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদের তত্ত্বাবধানে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত আল-আমিনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে খুলনার তেরখাদা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই আরও জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আল-আমিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, নিহত কামরুল ও আল-আমিন খুলনার একই এলাকার বাসিন্দা এবং পূর্বপরিচিত ছিলেন। কাজের সন্ধানে তারা ঢাকায় আসেন। গত ৯ আগস্ট আশুলিয়ার বাসাইদ এলাকায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে দুজনই রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন।
এরপর গত ১৪ আগস্ট রাতে কাজের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে কামরুল ও আল-আমিনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে আল-আমিন সবজি কাটার ছুরি দিয়ে কামরুলের গলায় আঘাত করেন। এতে ঘটনাস্থলেই কামরুলের মৃত্যু হয় বলে পিবিআইয়ের ভাষ্য। পরে মরদেহ গামছা দিয়ে বেঁধে রেখে আল-আমিন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
একজন শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার তাগিদে বাড়ি ছেড়ে এসেছিলেন ঢাকায়। স্বপ্ন ছিল কাজ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। অথচ সেই স্বপ্নের শহরেই নির্মমভাবে থেমে গেল তার জীবন।
“যে হাতে গাঁথা হতো ইটের পর ইট,
সেই হাত আজ নিথর—ফিরবে না আর কোনোদিন ঘরে।
রোজগারের আশায় যে মানুষ এসেছিল শহরে,
নীরব এক ঘরের অন্ধকারেই তার জীবনের হলো অবসান।”
পিবিআইয়ের ভাষ্য, বাড়িওয়ালা কোনো পরিচয়পত্র বা মোবাইল নম্বর না নিয়েই তাদের কক্ষ ভাড়া দেওয়ায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত এবং ঘটনার তদন্তে কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
মামলাটির তদন্ত তদারকি করছেন পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম. এন. মোর্শেদ। তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ পরিদর্শক মোঃ জামাল উদ্দিন।
একটি প্রাণ চলে গেছে, একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের আপনজন। এখন প্রত্যাশা—সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা আদালতে প্রমাণিত হোক এবং নিহত কামরুলের পরিবার ন্যায়বিচার পাক।এটাই তাদের পরিবারের দাবি