দাপ্তরিক প্রভাব বিস্তার, ঠিকাদারদের মধ্যে বিভাজন, দরপত্রের তথ্য ফাঁস ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামে কর্মরত অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মোহাম্মদ হোসেনকে ঘিরে দাপ্তরিক প্রভাব বিস্তার, অফিসে গ্রুপিং সৃষ্টি, ঠিকাদারদের মধ্যে বিভাজন, দরপত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনৈতিক হস্তক্ষেপ, দাপ্তরিক তথ্য প্রকাশ, অর্থ গ্রহণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন চট্টগ্রামের ঠিকাদার মোঃ আলি আকবর। আবেদনে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে, প্রভাববলয় তৈরির অভিযোগ
আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোহাম্মদ হোসেন ১৬ আগস্ট ২০০১ সালে গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি অফিসের অভ্যন্তরে একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে দাপ্তরিক পরিবেশে গ্রুপিং সৃষ্টি এবং নিজের মতের বাইরে অবস্থানকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, একজন অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের দায়িত্বের সীমার বাইরে গিয়ে যদি কোনো কর্মচারী দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত, কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা ঠিকাদারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে বিষয়টি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগের।
ঠিকাদারদের মধ্যেও বিভাজনের অভিযোগ
মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে ঠিকাদারদের মধ্যে বিভাজন তৈরির অভিযোগও করা হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়, একটি পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এর ফলে সাধারণ ও নিয়মিত ঠিকাদাররা কাজ করতে গিয়ে কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়েছেন কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
দরপত্রের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি দরপত্র-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ।
আবেদনকারীর দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারের হয়ে দরপত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে দরপত্র, নথি, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ কিংবা অন্যান্য সংরক্ষিত দাপ্তরিক তথ্য কোনো ঠিকাদারের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার ব্যবহারের তথ্য, অফিসের নথিপত্র, দাপ্তরিক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি করা হয়েছে।
লাইসেন্স করে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আবেদনকারীর ছোট ভাইকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে দেওয়ার কথা বলে মোহাম্মদ হোসেনের কাছে অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থ নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও লাইসেন্স করে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারী।
এ ছাড়া আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে আবেদনকারী উল্লেখ করেছেন।
ভয়ভীতি ও ঠিকাদারি কাজে বাধার অভিযোগ
আবেদনকারী মোঃ আলি আকবর দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে ঠিকাদার হিসেবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকিমূলক আচরণের কারণে বর্তমানে তিনি স্বাভাবিকভাবে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না।
একইভাবে আরও কয়েকজন ঠিকাদারও তাঁর প্রভাব ও চাপের কারণে সমস্যার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দাপ্তরিক গোপনীয়তা নিয়ে তদন্তের দাবি
অভিযোগে বলা হয়েছে, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোন কোন দরপত্র, নথি, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ বা অন্যান্য দাপ্তরিক তথ্য অফিসের বাইরে গেছে কি না—তা নথিপত্র, কম্পিউটার ব্যবহারের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দাপ্তরিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে।
লিখিত আবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি গণপূর্ত কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে সময় সংগঠনের পদ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে অফিসে প্রভাব বিস্তার করেছেন কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির লোক বা সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে একইভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগও আবেদনে করা হয়েছে।
আবেদনকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এখানে কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ বিচার করার বিষয় নয়; বরং কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক পরিচয় বা সংগঠনের পদ ব্যবহার করে দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন কি না, সেটিই তদন্তের বিষয়।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি উচ্চপর্যায়ের ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী, ভুক্তভোগী ঠিকাদার, কর্মকর্তা-কর্মচারী বা সাক্ষীদের ওপর কোনো ধরনের চাপ কিংবা প্রভাব বিস্তার যাতে না করা হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দরপত্র-সংক্রান্ত নথি ও কম্পিউটার ব্যবহারের তথ্য পরীক্ষা, লাইসেন্স করে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ যাচাই, অভিযুক্তের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ঠিকাদারদের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং ভয়ভীতি ও বাধা প্রদানের অভিযোগে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের কোনো অংশ তদন্তে সত্যতা পেলে সরকারি চাকরির বিধি, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
গণপূর্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে প্রভাববলয় তৈরি, ঠিকাদারদের মধ্যে বিভাজন, দরপত্রের গোপনীয় তথ্য প্রকাশ, অর্থ লেনদেন কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়গুলো প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলো কতটা সত্য, অর্থ লেনদেনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, দরপত্রের গোপনীয় তথ্য বাইরে গেছে কি না এবং দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে—এমন প্রত্যাশা করেছেন অভিযোগকারী মোঃ আলি আকবর।
অভিযুক্ত মোহাম্মদ হোসেনের বক্তব্য: এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।