সমাজে যখন ধর্মীয় বিভাজন, পারস্পরিক অবিশ্বাস কিংবা অসহিষ্ণুতার নানা খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে, ঠিক তখনই গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় ঘটে যাওয়া একটি মানবিক উদ্যোগ আমাদের নতুন করে আশাবাদী করে তোলে। একটি হিন্দু পরিবারের মেয়ের বিয়েতে মুসলিম প্রতিবেশীদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা শুধু একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা নয় এটি আমাদের বহুত্ববাদী সমাজের সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
টঙ্গীর আউচপাড়া হযরত আয়েশা (রাঃ) জামে মসজিদ-সংলগ্ন এলাকায় শুক্রবার মরহুম পুলক সরকারের মেয়ে প্রিয়াঙ্কা রানী সরকারের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বাবা-মাকে হারানোর পর প্রিয়াঙ্কা ও তাঁর ভাই সৌরভ সরকার বৃদ্ধ দাদির কাছে বেড়ে উঠছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের বিষয়টি স্থানীয় মুসলিম প্রতিবেশীদের নজরে এলে তাঁরা নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি বরং একটি পরিবারের আনন্দের দিনটিকে আনন্দময় করে তুলতে এগিয়ে এসেছেন।
আউচপাড়া রসুলবাগ বাড়ির মালিক সমিতির উদ্যোগে বিষয়টি নিয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লি আব্দুর রহমান, সমাজসেবক আব্দুল হাকিম এবং বাড়ির মালিক সমিতির সদস্যরা আলোচনা করেন ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ আলেকের সঙ্গে। পরবর্তীতে তিনি বিয়ের সার্বিক আয়োজনের সহযোগিতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয় প্রিয়াঙ্কার বিয়ের আয়োজন।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায় কোনো বাধা হতে পারে না। একজন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, একটি পরিবারের আনন্দে অংশ নেওয়া এবং বিপদের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই প্রকৃত মানবিকতা।
শেখ মোহাম্মদ আলেকের বক্তব্য “মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ধর্ম নয়, মানবতাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।” এই ঘটনার মূল চেতনাকেই ধারণ করে। তাঁর এই বক্তব্য শুধু একটি অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয় বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো মূলত পারস্পরিক সহাবস্থান, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুগের পর যুগ এ দেশের মানুষ ধর্ম-বর্ণের ভিন্নতা ভুলে একে অন্যের সুখে আনন্দিত এবং দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছে। আউচপাড়ার এই ঘটনাও সেই চিরন্তন মানবিক ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
আমরা মনে করি, সম্প্রীতির এমন ছোট ছোট উদ্যোগই সমাজে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ধর্মীয় পরিচয় যার যার বিশ্বাসের বিষয়; কিন্তু মানবিকতা সবার। তাই কোনো অসহায় পরিবার যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
প্রিয়াঙ্কা রানী সরকারের বিয়েকে ঘিরে আউচপাড়ার মুসলিম প্রতিবেশীদের এই সহযোগিতা তাই নিছক একটি বিয়ের আয়োজন নয় এটি সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনুকরণীয় বার্তা।
আমরা প্রত্যাশা করি, আউচপাড়ার এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য এলাকাতেও মানুষকে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে। বিভেদের দেয়াল নয়, মানবিকতার সেতু নির্মাণই হোক আমাদের সমাজের অঙ্গীকার।
মানুষ মানুষের জন্য এই সত্যই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।