শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
নদের একটি পাশে রয়েছে ৫ (পাঁচ)টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর দুই পাশে ৬ (ছয়) গ্রাম। এই (ছয়) টি গ্রামে প্রায় ২৫ (পঁচিশ) হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু এই গ্রামের মানুষের একটি বড় সমস্যা এবং একমাত্র ভোগান্তির কারণ একটি বাসের সাঁকো।
জলিলপুর-যুদিহুদা গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাহ্ম নদ আর নদে রয়েছে একটি মাএ সাঁকো, যার উপর দিয়ে এলাকার মানুষের দীর্ঘ ২৫ বছর পারা পার করছেন।
স্থানীয়রা জানান, এই স্থানে একটি সেতুর দাবি তাদের দীর্ঘদিনের, কিন্তু এখনো সেতু নির্মাণ হয়নি। প্রথম ২৫ (পঁচিশ) বছর মানুষ নৌকায় পার হয়েছেন, আর পরের ২৫ (পঁচিশ) বছর পার হচ্ছেন সাঁকো দিয়ে। গত বছর নদী খননের সময় সেই সাঁকোটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরে এলাকার মানুষ নিজেদের অর্থায়নে আবার এটি তৈরি করেছেন। এমন পরিস্থিতি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা শহরের উত্তর পাশের গ্রামগুলোর।
যুগিহুদা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, মহেশপুর উপজেলা শহরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এই নদের ২ (দুই) পাড়ে রয়েছে জলিলপুর, যুগিহুদা, কদমতলা, সড়াতলা, নিমতলা ও বেড়েরমাঠ গ্রাম। এর মধ্যে যুগিহুদা গ্রামটি ৩ (তিন) দিক থেকে কপোতাক্ষ নদে ঘেরা। তিনি আরও জানান, এসব গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন প্রায় সব কাজই করতে হয় জলিলপুর বাজারে। এই বাজারেই রয়েছে একটি কলেজ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা ২ (দুই) টি মাদ্রাসা। এসব প্রতিষ্ঠানে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই বাঁশের সাঁকো পারাপার হয়।
রবিউল ইসলাম জানান, যেখানে বর্তমানে সাঁকো রয়েছে, তার ২ (দুই) পাশে প্রায় ২ (তিন) কিলোমিটার দূরে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর পাশের এলাকার মানুষ এতে উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু এই ৬ (ছয়) গ্রামের মানুষকে মহেশপুর বা জলিলপুর শহরে যেতে হলে অন্তত ৪ (চার) কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়।
মহেশপুর পৌর মহিলা কলেজের শিক্ষক ও যুগিহুদা গ্রামের বাসিন্দা এম. এ. আসাদ জানান, ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন ৬ (ছয়) টি গ্রামের মানুষ কষ্ট করে নৌকায় পার হচ্ছেন। পারাপারের খাজনা হিসেবে অনেকের মাসিক চুক্তিও ছিল। পরে ৯০(নব্বই) -এর দশকে এলাকার মানুষ গ্রামে গ্রামে বাঁশ সংগ্রহ করে সাকো তৈরি করেন। এরপর সবাই সেই সাকো দিয়ে পার হতে শুরু করেন। কিন্তু ২ (দুই) বছরের বেশি সাঁকো টেকে না, ভেঙেচুরে যায়। তাই প্রতি ২ (দুই) বছর পর নতুন করে সাঁকো তৈরি করতে হয়। তিনি বলেন, নতুন করে সাঁকো তৈরি করলে কিছুদিন মোটামুটি চলাচল করা যায়। এরপর আবার ভেঙে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়েই চলাচল করতে হয়। এভাবে চলতে চলতে প্রায় ২৫ (পঁচিশ) বছর পার হয়ে গেছে। গত বছর কপোতাক্ষ নদ খনন করা হয়। সেই সময় তাদের তৈরি বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে দেওয়া হয়। তখন মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না। পরে গত ডিসেম্বর মাসে তারা আবার নতুন করে সাঁকো তৈরি করেছেন। এই সাঁকো তৈরি করতে তাদের অনেক টাকা ব্যয় হয়, যা এলাকার মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই দেন।
সরেজমিনে সাঁকোর স্থানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সবসময়ই সাঁকোর ওপর মানুষ চলাচল করছে। কেউ এপার থেকে ওপারে যাচ্ছেন, আবার কেউ ওপার থেকে এপারে আসছেন।
শেফালী বেগম নামের এক বৃদ্ধা কষ্ট করে বাঁশ ধরে সাকো পার হচ্ছিলেন। তিনি বলেন, বাবা, এত কষ্ট করা যায় না। নুর আলী নামের আরেক পথচারী জানান, মাঝে মধ্যেই পত্রিকায় অপ্রয়োজনীয় সেতুর খবর দেখা যায় যেখানে দুই পাশে রাস্তা নেই, কিন্তু মাঝখানে সেতু আছে। অথচ তাদের এখানে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সেতু হচ্ছে না। ফলে ৬ (ছয়) গ্রামের হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তাদের ও পাশের গ্রামগুলোর মানুষ এখন কাজ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। দৈনন্দিন জীবনে তেমন কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা একটাই চলাচলের জন্য এই বাঁশের সাকো, যার দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশা করেন।
জলিলপুর বাজার কমিটির সভাপতি হায়াত আলী জানান, এখানে একটি সেতু খুবই প্রয়োজন। কোমলমতি শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো দিয়ে পার হয়, যা দেখলে সবারই ভয় লাগে। এই সাঁকোতে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজার থেকে টাকা তুলে এই বাঁশের সাঁকোটি মেরামত করা হয়।
জলিলপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তি রানী বসু জানান, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুগিহুদা গ্রামের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। তারা প্রতিদিন খুব কষ্ট করে এই সাকো দিয়ে যাতায়াত করে।
জলিলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিছুজ্জামান জানান, তাদের বিদ্যালয়ে যুগিহুদা, কদমতলা, সড়াতলা, নিমতলা ও বেড়েরমাঠ গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে। তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুলে আসে-যায়। তিনি বলেন, একটি সেতুর জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন, কিন্তু এখনো কোনো ফল হয়নি।
এলজিইডির মহেশপুর উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ শাহরিয়ার আকাশ জানান, এই স্থানে একটি সেতু নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। অনূর্ধ্ব ১০০ (একশত) মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর জন্য তিন দফা প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পেলে তারা সেতুর কাজ শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন।