লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি লুটেরাদের উৎল্লাস!
শাহীন মির্জা
যখন ঝড় হয় তখনই সাহসিকতার সহিত আমকুড়াতে হয়। দেশ স্বাধীনতার পর অনেক চড়াই উৎরায় পার হলেও কোন সরকার স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দেশ প্রেমে মজিয়া দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করিয়া দৃষ্টান্তমূলক আমূল সংস্কার ঘোষনা করে নাই। যে দেশে জন্মের পর তার জন্ম নিবন্ধনের জন্য ঘুষ দিতে হয় সে দেশে ঐ শিশু বড় হয়ে দুর্নীতিবাজ হলে অবাগ হবার কিছুই নাই। মৃত্যু সনদ আনতে ও ঘুষ লাগে এই দূর্নীতি অনিয়মের সংস্কৃতি একদিনের না। সভ্য সমাজ গড়তে হলে সুশাসনের কোন বিকল্প নাই। নীতি নির্ভর রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জবাব দিহিতা মুলক রাষ্ট্র গঠনের এখনই শ্রেষ্ঠ সুযোগ। অসম বন্টন সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য সংস্কার করতে পারলে এবং সকল নাগরিকের আয় বহিভূর্ত সম্পদ রাষ্টীয় কোষাগারে জমা করতে পারলে কয়েক বছরের মধ্যে এদেশ সিঙ্গাপুরের মত উন্নত দেশ হবে নিশ্চিত। এক বর্ষিয়মান নেতা তো প্রস্রাবের কর্মসূচি দিয়ে জনগনকে বঙ্গোপোসাগরে ভাসাতে চাচ্ছে! আরেক নেতা বলে ঢাকা অচল করে দিবে। অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করতে আসা আতœঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের জ্ঞানের অভাব, সুশিক্ষার অভাব, আদর্শ নীতির অভাব, শ্রদ্ধাবোধ, শিষ্টাচার আর মনুষ্যত্বের অভাব আরো অভাব কৃতজ্ঞতাবোধের। বিশে^র সেলিব্রেটি ব্যক্তি হলেন ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস তাকে আমরা কোনঠাসা করে বেইজ্জতি করতে আমাদের একটুকু লজ্জাবোধ হয় না, কত বড় হতভাগার দল আমরা? রাষ্ট্র কাঠামো গঠনে ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস পরাজিত হলে বাংলাদেশ পরাজিত হবে, আমাদের বিবেক মনুষ্যত্ব নির্বাসনে যাবে, দলদাস আর হুকুমের গোলাম হয়েই থাকতে হবে আমাদেরকে। কিন্তু কিছু কুলাঙ্গার নেতা এখনো চায় বাংলাদেশ সারাজীবন পরের হুকুমের গোলামী করুক। দুর্নীতি মুক্ত, বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের সংস্কারের জন্য এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। দুর্নীতি অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সংস্কার এখন না করতে পারলে আগামী ১০০ বছরে আর কেউ সংস্কার করার সাহস দেখাবে না। আমরা দেখেছি বিগত সরকারের আমলে অবৈধ অর্থ বা কালো টাকা সাদা বা বৈধ করার জন্য ১৫% কর দিলেই বৈধ হতো অর্থাৎ চোরকে ডাকাত, ডাকাতকে দানব বানানোর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহ জোগানো হতো। নেতাদের উদ্দেশ্য একটাই ক্ষমতা পেলে গাছের শিকড় বাকড় পর্যন্ত খেয়ে ফেলবে দুর্নীতির অর্থই তাদের প্রিয় খাদ্য। ঘোড়া লাল হউক সাদা হউক রং আলাদা হলেও বংশগত বা জিনগত আচরণ একই থাকে, দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুমায়-ছোলাই তার প্রিয় খাদ্য। যুগ যুগ ধরে মেধাহীন দুবৃর্ত্তরা অনেক জায়গায় নেতৃত্তে¡ আছে। নেতারা রাজনীতিকে এখন পুঁজিবাদি লাভজনক ব্যবসা মনে করছে। তাই দেশ ও জনতার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না, সর্বক্ষেত্রে বৈষ্যের কালোছায়া। রাজনৈতিক পরিচয়ে একজন পিয়ন যদি ৪২৬ কোটি টাকার মালিক হয় এবং চলেন হেলিকপ্টার দিয়ে আর একজন ড্রাইভার আবেদ আলী যদি হয় হাজার কোটি টাকার মালিক তবে তো জান প্রাণ দিয়ে নীতি আদর্শ বাদ দিয়ে রাজনীতির ছায়াতলে থাকাই ভালো। স্বার্থে আঘাত লাগলে বা স্বার্থ উদ্দেশ্য উদ্ধার না হলে দল বদল করে এরা দল বদলের নেতা হয় সকালে যাকে বাপ, দাদা বলে বিকালের ভাষনে তাকে সালা বলে! এদের এক অঙ্গে কত রুপ বুকে আর মুখে কত রকমের আদর্শ ধারণ করে। এমন কিছু লোকের জন্য রাজনীতি আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, বির্তকিত হচ্ছে। আমরা সংস্কার চাই ব্যক্তির, দলের, প্রশাসনের, শিক্ষার, নির্বাচন পদ্ধতির, চিকিৎসার ও সংবিধানের-¯্রােতে আর গা ভাসাতে চাই না। ¯্রােতে কচুরি পানাও ভেসে যায় এতে কোন কৃতিত্ত¡ নাই। দল আসে দল যায় সব দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্য চোখের ক্ষুধার জ¦ালা প্রায় একই। দল বিপদে পড়লে মিছিল মিটিংয়ে জনগণের প্রয়োজন তখন কদর বাড়ে আর ক্ষমতায় গেলে আতœীয়-স্বজন পরিবারকে নিয়ে হাজার কুটি টাকার লুট পাটের রাম রাজত্ব কায়েম করে। যদি নতুন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসা মানে নতুন বোতলে পুরানো মদ-একই ঘ্রাণ একই স্বাদ একই তৃপ্তির ঢেকুর উঠে তবে দল পরিবর্তনে আমাদের কি লাভ হবে? যেখানে মেধার যোগ্যতায় মনুষ্যত্তে¡র বিবেচনায় শুধু রাজা নয়, কামারের ছেলে, মুচির ছেলেও যেনো রাষ্ট্র প্রধান হতে পারে এই ধারায় আমাদের নীতি ও চিন্তার প্রয়োজন। শরীর মোটা তাজা থাকলে অবৈধ অর্থ থাকলে নেতার পিছনে হালুয়া রুটির অভাবী দুই তিনশত লোক থাকলেই তিনি বিশাল ভয়ংকর নেতা। অথচ মাওলানা ভাসানি, তিতুমীর, একে ফজলুল হক, শহীদ জিয়ার মত নেতাদের আদর্শ আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ছিটা ফোটা ও নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য শোষিত মজলুম মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, আমজনতার নিপিড়িত মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার নামই রাজনীতির নেতা। অনিয়ম, আধিপত্যবাদ, দুর্নীতিবাজ, সা¤্রাজ্যবাদ, স্বজনপ্রীতি, অসম বন্টনের, স্বৈরশাসন, খাদ্যপন্যে সিন্ডিকেট, চিকিৎসা ক্ষেত্রের সিন্ডিকেট, শিক্ষা ক্ষেত্রে, দুর্নীতিবাজ সরকারী চাকরিজীবিদের আয় বহিভ‚ত হাজার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এর বিরুদ্ধে সংস্কার প্রয়োজন। শহীদ জিয়ার আর্দশ নীতি, দেশপ্রেম, দূরদশির্তা বর্তমান বিএনপি নেতাদের মাঝে প্রস্ফুটিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এখন দলের নাম বেচে মাঠে যারা হুংকার দিচ্ছে তাদের বেশীর ভাগই অন্যদল থেকে আশা অনুপ্রবেশকারী হাইব্রীড নেতা, মতলবাজ, এরা দল বদলের নেতা সুবিধাবাদী ওরাই গিরগিটির মত রং বদলায় দলকে ডুবায়। যে দল ক্ষমতায় আসে ঐ দলেরই দালালী করে তারা দলের আদর্শ নয় নিজের স্বার্থ খোজে আখের গোছায়। ওরা নেতা নির্ভর রাজনীতি করে ওরা লেজুরবৃত্তি রাজনীনিতে অভ্যস্থ ওরাই লুটেরা ওদেরই আনন্দ উৎল্লাস বেশী থাকে। ২৪ শের গণঅভুন্থানে ছাত্র জনতার রক্তে রাজপথ ভিজে যায় অনেকে শহীদ হয় আর এখন টাকার বিনিময়ে স্বৈরাচারকে পূর্ণবাসন করার জন্য অনেকেই গোপনে বৈঠক করে। ওরা বড়ই ভয়ংকর ওরা মৌসুমে মাছ শিকার করতে জানে। এরা বোঝে রাজনীতির মাঠে কারো ঘর পোড়ে কেউ আলু পোড়া খায় সুযোগে সৎ ব্যবহার করতে এরা পিছ পা হয় না। আজ কেউ ভেবে দেখেছেন কি শেখ পরিবারের একজনও কি গ্রেফতার হয়েছে? লুটেরা ঠিকই সবাই নিরাপদে বিদেশে রাজার হালে আছে। আর দেশের নিরিহ কর্মীগুলো ভয়ভীতি আতœচিৎকার, গ্রেফতার গণধোলাই আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। রাজনীতি অঙ্গনে এখন কর্মীর থেকে নেতা বেশী কারণ নেতা হলে হুংকার, গর্জন, দাম্ভিকতা পেশি শক্তি বেশী তাই চাঁদার পরিমাণ ও বেশী। আজ শহীদ জিয়ার নীতি আদর্শ স্বপ্ন দেশপ্রেম বেশীর ভাগ নেতার মাঝেই খুজে পাওয়া যায় না। গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী তিনি জেল জুলুম বাড়ীছাড়া হলেন-বিদেশে চিকিৎসা করতে পারলেন না, তবু স্বৈরাচারের সাথে আপোষ করেনি। যারা দেশের ইতিহাস ভুলে যায় তারা বিপদগামী হয়, আর যারা দলের ইতিহাস ভুলে যায় তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। আজ সংস্কারের কথায় অনেকের গাত্রদাহ হচ্ছে, আবার যারা বলে ক্ষমতায় এলে সংস্কার করবো বলছে তবে ৫৪ বছরে সংস্কার করলেন না কেনো? তারা ৫৪ বছরে কার্যকর কোন আমূল সংস্কার করতে পারছেন কি? আওয়ামীলীগের ১৬ বছরের ক্ষমতার সময় খালেদা জিয়ার জেলে ৩০ টাকার ইফতার নিয়ে কি কেউ আন্দোলন করেছেন? খালেদা জিয়ার বাড়ীর সামলে বালুর ট্র্যাক সরাতে পারলেন না, সংগ্রাম করে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠাতে পারলেন না, তারেক জিয়ার মামলা নিষ্পত্তি করে দেশে আনতে পারলেন না, সংগ্রাম করে ১৬ বছরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণের ভোটের অধিকার আদায় করতে পারলেন না, সালাউদ্দিন কে শিলংয়ে ফেলে রাখা হয়, জয়নুল আবেদিন ফারুকে পিটিয়ে নগ্ন করা হয়, ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয় অথচ দলীয় ভাবে বড় কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। আজ অনেকেই সংস্কারকে মানবে না বলে হারকিউলিকসের মত শক্তি দেখাচ্ছে আর টারজানের মত হুংকার দিচ্ছে। এই শক্তি হুংকার ১৬ বছরে কেনো দেখাতে পারলেন না? আমাদের জীবনমান পরিবর্তন সর্বক্ষেত্রে আমূল সংস্কার উন্নয়ন আমাদেরই করতে হবে জ¦ীন পরী এসে করে দিবে না। নির্বাচনের পরে সংস্কার করতে গেলে ব্যক্তি ও দলের মাঝে আঘাত লাগে তাই আর সংস্কার হয় না। তখন হয় অবৈধ টাকা কামানোর নোংরা প্রতিযোগিতা কে কত বাড়ী-গাড়ী ব্যাংক মার্কেট আর বেগমপল্লী বানাবেন এবং শত শত বছর চৌদ্দপুরুষ বসে বসে খেতে পারবেন এই প্রতিযোগীতায় ৫ বছর শেষ হয়। শরষের মধ্যে ভ‚ত-ভ‚ত তাড়াবেন কি ভাবে? বেড়ায় তো ক্ষেত খাচ্ছে ভয় তো এখানে! ঘুম থেকে উঠে নির্বাচন দিলেই কি এই মহাদুর্নীতি রোধ করতে পারবেন? আমরা গণতন্ত্রের নাগরিক হিসাবে আমরাও নির্বাচন চাই, জনগন যাকে ভোট দিবে সে ক্ষমতায় আসুক রাষ্ট্র চালাক আমাদের আপত্তি নাই বিদ্রæপমুল কোন কথাও নাই। কিন্তু সবার অধিকার পূর্ণ প্রয়োগ করতে পারে বাক স্বাধীনতা থাকে, মৌলিক অধিকার থাকে, নিরাপত্তায় জীবন ধারণ করতে পারে, চাঁদাবাজি, দখল বাজি থেকে মুক্ত হতে পারে, সরকারী বেসরকারী দুর্নীতি বাজদের জবাব দিহিতা থাকে, আয় বর্হিভ‚ত সম্পদ যেনো সরকারী কোষাগারে যায়, এমন সব সংস্কারের পরে আমরা নির্বাচন দেখতে চাই। আজ কালো টাকার দূর্বৃত্তায়নের হাতে রাজনীতি চলে গেছে। লেজুরবৃত্তি রাজনীতি বন্ধ করতে হবে, না পারলে দেশীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেউ বলছে নির্বাচন হলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, যদি দেশ ও জনগণকে ভালোবেসে থাকে তবে ডঃ মোহাম্মদ ইউনুসকে ঐ যাদুর পদ্ধতি দিয়ে সহযোগিতা করছেন না কেনো? অনেকে তাকে সর্বক্ষেত্রে অযোগ্য বলছেন, তিনি রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা বোঝে না, তিনি অনির্বাচিত, তিনি দৈত্য নাগরিক, তিনি সুদখোর ইত্যাদি এত যদি অযোগ্য হয় তবে তার অধীনে আপনারা নির্বাচন চান সেটা সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে ভাবলেন কি ভাবে? স্বৈরাচারের পরাধীনতার রক্ত চক্ষুর শৃঙ্খল ভেঙ্গে ৫ইআগষ্ট ছাত্রজনতা নতুন সূর্য উপহার দিল প্রায় দুই হাজার প্রাণের রক্তের বিনীময়ে দুই হাজার মায়ের বুক খালি হলো কিন্তু আজ যারা নির্বাচন চেয়ে হুংকার দিচ্ছেন তারা কি এই শহীদের হত্যার বিচার চেয়ে মিছিল মিটিং মানববন্ধন করেছেন? একবার কি বলেছেন আগে বিচার হবে সংস্কার হবে পরে নির্বাচন হবে? আমরা কারো ইশারায় চলি কলকাঠি নাড়ে অন্য কোন মুরব্বি দেশ থেকে। নীতি নির্ভর রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন সবাইকে অসহায় হয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে লুটেরাদের উৎল্লাস আমাদের চোখের জল-এটাই হবে রাজনীতির যোগফল।
লেখকঃ সাংবাদিক, কলামিষ্ট, নাট্যকার